১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দেওবন্দে ঈদের খুশি

-

মাদরাসা ছুটি হয়ে গেছে। একে একে ফিরতে শুরু করেছেন বিভিন্ন প্রদেশের ছাত্ররা। কেবল বাংলাদেশীরা রয়ে গেছেন। যাওয়ার তাদের জায়গা নেই। এত অল্প সময় নিয়ে দেশে যাওয়া যায় না। দেওবন্দই তাদের বাড়ি। এখানেই তাদের কাটাতে হবে ঈদের ছুটিটা।
তিন মাস হলো দেওবন্দে এসেছি। প্রথম প্রথম মা-বাবার কথা, বাড়ির কথা, গ্রাম ও গ্রামের মানুষের কথা বড্ড মনে পড়লেও এখন অনেকটা সয়ে গেছে। কিন্তু স্থানীয় ছাত্রদের বাড়ি ফেরা দেখে নাড়ির টান ফের যেন আমাকে পেয়ে বসল। ইচ্ছে হচ্ছিল, ডানা মেলে উড়ে যাই সবুজে ছায়া গ্রামটায়। নিয়ে আসি মায়ের আদুরে হাতের একটু পরশ।
কোলাহলপূর্ণ মাদরাসা হঠাৎই যেন নীরব হয়ে এলো। সবসময় মাদরাসা প্রাঙ্গণ যেখানে ছাত্রদের পদচারণায় মুখরিত থাকত, সেখানে আমরা দু-চারটে প্রাণী ছাড়া কিছুই নেই। ফাঁকা মাদরাসায় আমরা কয়েক বন্ধু গল্প, আড্ডা আর খেলাধুলায় কাটাতে লাগলাম সময়। কখনো ঘুরে ঘুরে দেখতাম দেওবন্দ মাদরাসার সুরম্য দালানগুলো। কখনো হাঁটতে চলে যেতাম অনেক দূরে। হেঁটে হেঁটে দেখতাম উত্তর প্রদেশের গ্রামীণ পরিবেশ। অপূর্ব দৃশ্যপটগুলো স্মৃতির পাতায় এঁকে ফিরতাম মাদরাসায়।
রুমমেট খালেদ ভাইয়ের কাছে জানতে পারলাম, মাদরাসার পক্ষ থেকে প্রায় তিন শ’ মহিষ কোরবানি করা হয়। ঈদের দিনসহ তিন দিন জবাই করা হয় এগুলো। মাদরাসায় যেসব ছাত্ররা থাকেন, তারা যত ইচ্ছে তত গোশত নিতে পারেন। এমন সুযোগ আর হয় না। ভাবলাম, গোশত খাওয়ার আনন্দ দিয়ে বাড়ি না যাওয়ার দুঃখটা ভুলতে হবে!
ঈদের আগের দিন সকালে খালেদ ভাই নিয়ে গেলেন কোরবানির মহিষ দেখাতে। মাদরাসার বাইরে সব বাধা। একসাথে এত মহিষ হয়তো দেখিনি আর। কালো হয়ে আছে পুরো জায়গাটা। ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ বলে বিকল্প হিসেবে মহিষ কোরবানি করেন এখানের মুসলমানেরা।
বিকেলে আমি আর খালিদ ভাই বাজার করে নিয়ে এলাম। সেমাই, চিনি, মসলা কোনোটাই বাদ পড়েনি। ঈদের দিন সকালে খুব ভোরে উঠে পড়লাম। গোসল সেরে সেমাই খেয়ে গেলাম মসজিদে রশিদে ঈদের নামাজ পড়তে। তাজমহলসদৃশ মসজিদে আজ মানুষের ঢল নেমেছে। নামাজ পড়ে ফিরে এলাম রুমে। ঘণ্টা তিনেক পর গেলাম গোশত তুলতে। ছাত্রদের লম্বা লাইন লেগে আছে। একটু পর শুরু হলো গোশত দেয়া। বিশাল সাইজের একটা রান নিয়ে ফিরলাম রুমে। খালেদ ভাইও নিয়ে এসেছেন একটা রান। দুজনে মিলে লেগে গেলাম কাটাকাটির কাজে। অভ্যাস না থাকায় ক্লান্ত হয়ে পড়ি। থেমে নেই তবুও আমরা। জোহরের আগেই সব কাজ শেষ। গোশত রান্না করলাম কয়েক আইটেম করে। অতিরিক্ত গোশত জ্বাল দিয়ে রাখলাম। ছাদে শুঁটকি দিলাম কিছু। দুজন মানুষ কত গোশত খাওয়া যায়! খেতে খেতে আমরা ক্লান্ত। এভাবে গোশত আসবে আরো দু’দিন। আর না উঠানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। পরে আবার নষ্ট হতে পারে।
বিকেলে ঘুরতে বেরোলাম আমরা। পুরোটাই হিন্দু এলাকা। তাই বাংলাদেশের মতো ঈদের প্রভাব অতটা পড়ে না। আখক্ষেতের আল ধরে হেঁটে গেলাম অনেক দূর পর্যন্ত। সূর্যটা ক্রমেই হেলে পড়ছে পশ্চিমাকাশে। নীড়ে ফিরতে শুরু করেছে পাখিরা। আমরাও ফেরার পথ ধরলাম।

সাভার, ঢাকা


আরো সংবাদ