২২ নভেম্বর ২০১৮

ভালোবাসার শাটল ট্রেনে স্বপ্নের মৃত্যু : জীবনের বাঁকে বাঁকে

-

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) অন্যতম গৌরব ও ঐতিহ্য শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম শাটল ট্রেন। বর্তমানে পৃথিবীর একমাত্র শাটলের ক্যাম্পাস চবি। ক্যাম্পাসজীবনের প্রথম দিন থেকেই ধীরে ধীরে এই শাটল ট্রেনের প্রতি অগাধ ভালোবাসা সৃষ্টি হয় প্রতিটি শিক্ষার্থীর মনে।
কিন্তু সেই শাটল ট্রেনেই কাটা পড়ল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র রবিউল আলমের স্বপ্ন।
চট্টগ্রামের বটতলি স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার শিডিউল শুরু হয় প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে। তখন থেকেই ক্যাম্পাসে যাওয়ার জন্য শত শত শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে থাকেন ষোলশহর স্টেশনে।
প্রতিদিনের মতো আজো (৮ আগস্ট ২০১৮) ৮টা ২০ মিনিটে ট্রেন এসে হাজির হয় ষোলশহর স্টেশনে। শুরু হয় স্টেশনের সেই চিরচেনা দৃশ্য। শুরু হয় জীবনের ঝুঁঁকি নিয়ে ট্রেনে ওঠার চেষ্টা। উঠতে গিয়েই কাটা পড়ে রবিউল আলমের দুই পা।
চলতি ১২ আগস্ট তার মাস্টার্স পরীক্ষা। মাস্টার্স শেষ করেই বিসিএস দেয়ার পরিকল্পনা ছিল তার। বিসিএসের জন্য লেখাপড়াও করছিলেন মনোযোগ দিয়ে। পাশাপাশি পরিবারের হাল ধরার জন্য অন্য চাকরিও খুঁজছিলেন। কিন্তু শাটল তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ল।
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হ্নিলার দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান রবিউল। ভাইবোনের মধ্যে পঞ্চম হলেও তার দিকেই তাকিয়ে ছিলেন বাবা-মা।
প্রবাসী বড় ভাই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আলাদা সংসার করেন। থাকেনও এলাকার বাইরে। আর বড়দের মধ্যে অন্য দুই ভাই নাফ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু দুই বছর আগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় অভাবের মধ্য দিয়েই চলছিল তাদের সংসার।
তার ছোট ভাইদের একজন চবির রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। আর অন্যজন সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। নিজে দুটো টিউশনি করেই ছোট ভাইদের কোচিং ফি, পড়ালেখাসহ হাতখরচের ব্যবস্থা করতেন।
রবিউলের ছোট ভাই চবি শিক্ষার্থী রফিক বলেন, আমাদের আর্থিক অবস্থা একেবারেই খারাপ। এখনো নাফ নদীতে মাছ ধরার অনুমতি দিচ্ছে না সরকার। তাই সমস্যায় আছি। ভাইয়া দুটো টিউশনি করে আমাদের নিয়ে চিন্তা করতেন। ছোট ভাইয়ের পড়ালেখার খরচ চালাতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আলী আজগর চৌধুরী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা যথেষ্ট চেষ্টা করছি। তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। আর্থিকভাবে সব ধরনের সহযোগিতা আমরা দেবো।
রফিক বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, মেডিক্যালের চিকিৎসক এবং ভাইয়ের বন্ধুদের পক্ষ থেকে যথেষ্ট আন্তরিকতা পেয়েছি। আলী আজগর স্যার আমাদের সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রতি বছরই শাটল ট্রেনে যাতায়াত করতে গিয়ে আহত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আর মাত্র কিছু দিন পরই শেষ হতো রবিউলের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন। কিন্তু ট্রেনে কাটা পড়েই তার সব শেষ হয়ে গেল।
রবিউলের বন্ধু মোস্তফা কামাল আক্ষেপ করে বলেন, আগের দিন রাতেও সবাই আড্ডা দিলাম। ফোনেও কথা বলেছি। কিন্তু ভোরে উঠেই এ সংবাদ শুনে দিন শুরু করতে হবে এটা কার কপালে আছে! সংবাদটা শোনার পর হাঁটতেও পারছিলাম না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বলেন, আর কত হাত-পা হারালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের চোখ খুলবে। বারবার বগি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে এলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।
লেখক : শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ