২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

পাপমোচন : চারাগল্প

-

সাজেদ উল করিম। সৎ ও ন্যায়নিষ্ঠ একজন সরকারি কর্মকর্তা। স্রোতের বিপরীতে চলা একজন সাদামাটা মানুষ। একজন আদর্শ স্বামী ও আদর্শ পিতা।সরকারি সুযোগ সুবিধের বাহিরে যে মানুষটি এক কানাকড়িও পর্যন্ত কোনোদিন ঘুষ খায়নি।অথচ চতুর্দিকে আয়বহির্ভূত টাকার ছড়াছড়ি। শুধু একটু হাঁ করলেই কাঁড়িকাঁড়ি টাকা, অর্থবৈভবের পাহাড় করতে পারত। অবশ্য সাজেদকে নিয়ে অফিসে ও অফিসের বাইরে বন্ধুমহলে নানান কানাঘুষা ও হাসিঠাট্টার কমতি নেই। কেউ কেউ শ্লেষোক্তি টিপ্পনীও কাটে, ‘হায়রে, আমার নীতিবান অফিসার রে!’ সাজেদ সব কিছু মুখ বুজে শোনে। সহকর্মীদের মনোভাব বুঝতে তার একটুও কষ্ট হয় না। সব শুনেও সে চুপ করে থাকে। নিজের নীতি ও আদর্শ থেকে তবুও কোনো দিন এক বিন্দু বিচ্যুত হয়নি। প্রতিদিন কষ্ট করে পায়ে হেঁটে হেঁটে অফিসে যায়। আবার আসে। মাইনে যেটুকু পায়, তাতে অবশ্য মাসের অর্ধেকও চলে না। তবুও কেটে যায় দিন, মাস, তিথি। কোনো এক অদৃশ্য জাদুকাঠিতে জিনাত পুরো সংসারটা আগলে রেখেছে। কিছুটা টানাপড়েন থাকলেও টেনে নিয়ে যায়। বাসা ভাড়া, সাংসারিক মাসকাবারি খরচ, বিদ্যুৎ ও গ্যাসবিলে বেতনের প্রায় বেশির ভাগ ভাগই খরচ হয়ে যায়। যেটুকু অবশিষ্ট থাকে সেটুকু দিয়ে একমাত্র ঋভু ও ঋষিতার পড়ালেখার খরচ চলে না। বাধ্য হয়ে অন্য দিকে একটু টেনেটুনে হলেও বাচ্চাদের পড়ালেখা ও টিউশন ফির খরচ চালাতে হয়। ঋভু এবার বিবিএতে পড়ছে, ঋষিতা ক্লাস নাইনে। একেকটি ভোর আসে স্বপ্ন ও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। অফিসের একমাত্র পিয়ন লিয়াকতের ঢাকা শহরে একটা নিজস্ব ফ্ল্যাট বাড়ি রয়েছে। এসব অন্তহীন ভাবনায় প্রতিদিন বাসায় ফেরে সাজেদ। আজ বাসায় ফেরার পথে ছোট্ট একটা ঘটনা ঘটে যায়। পথে কড়কড়ে এক হাজার টাকার একটি নোট দেখতে পায় সাজেদ। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে টাকাটা হাতে তুলে নেয়।
অনেকটা মাথা নিচু করে বাসায় ঢুকে সাজেদ। হাতে কিছু নেই। সাংসারিক রোজনামচায় মাসকাবারি খরচের অনেক কিছুই আজ হাতে থাকার কথা। চোখেমুখে ক্লান্তি ও বিধ্বস্ততার ছাপ। বাসায় ঢুকতেই জিনাতের সাথে দেখা।
‘ক্ষমা করো জিনাত। আমি পারলাম না, তোমাকে দেয়া কথা রাখতে।’
‘সে কি গো! কী বলছো এসব?’
‘হুমম... ঠিকই বলছি। খালি হাতে ফিরেছি, কিছুই তো আনতে পারিনি।’
‘হতাশ হয়ো না লক্ষীটি, একটু শান্ত হও। মনকে আরেকটু শক্ত করো, প্লিজ।’
‘সান্ত্বনা দিচ্ছ?’
‘হ দিচ্ছি। তো কী হয়েছে? তুমি তো অত সহজে ভেঙে পড়ার মানুষ নও! বিগত পঁচিশটি বসন্ত ধরে তোমাকে চিনেছি, জেনেছিÑ আরো চেনার বাকি আছে বলছো?’
কথা বাড়ায় না সাজেদ। আসলে ভেতর থেকে কথা বের হতে চায় না। রাস্তায় কুড়িয়ে পাওয়া টাকাটা অসহ্য যন্ত্রণা দিচ্ছে। শুধু বড় একটা দীর্ঘশ্বাস আছড়ে পড়ে বুকের গহিন থেকে। খুব বড়সড় একটা শব্দ। ধারে কাছে কোথাও দড়াম করে কিছু পড়ার মতো। ভাঙনের শব্দ। পাঁজরটা ভেঙে গেল না তো! অজান্তেই বাম হাতটা বুকের বাঁ পাশে চলে যায়। চকিত চাহনিতে সাজেদ জিনাতের সুন্দর মুখপানে তাকায়। শব্দটা শুনতে পায়নি তো ও? সাজেদ জিনাতের প্রতিক্রিয়া বোঝার চেষ্টা করে। নির্লিপ্ত চাহনি। পাশে ঋভু আর ঋষিতা দিব্যি ঘুমুচ্ছে। না, সবই তো ঠিকই আছে। তাহলে শব্দটা কোথায় হলো? সে কি! বুকটা এত খাঁ খাঁ করছে কেন? ভেতরটা চিনচিন করে ব্যথা করছে কেন? নিজেকে এমন অস্থির লাগছে কেন? তবে কি ক্ষণিকের পাপের কারণেই এমনটা লাগছে? লাখ লাখ টাকার লোভ সামলাতে পারা মানুষটা মাত্র হাজার টাকার লোভ সামলাতে পারেনি কেন? সাজেদ নিজেকে প্রশ্নবাণে মুহুর্মুহু জর্জরিত করছে। এই টাকা খরচ করবে কোথায়? কাকে খাওয়াবে? প্রাণপ্রিয় বউ জিনাতকে? নাকি ফুলের মতো নিষ্পাপ ঋভু ও ঋষিতাকে? সেও কি নিজে ভোগ করতে পারবে? অস্ফুটস্বরে সাজেদ বলে ওঠে, ‘না না এটা অসম্ভব, এটা কিছুতেই হতে পারে না। এই পাপাচার বরদাশত করা যায় না। এক্ষুনি টাকাটা জায়গামতো রেখে আসতে হবে।’ সম্বিৎ ফিরে আসে জিনাতের মিষ্টি ডাকে।
‘অ্যাই শুনছো? বিড়বিড় করে কী বলছো?’
‘হু’
‘শরীর খারাপ লাগছে?’
‘উঁহু, কই না তো!’
‘আর কতক্ষণ এভাবে লেবুর শরবতের গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরে রাখব? এবার একটু নাও। খেয়ে দেখো, দেখবে খুব প্রশান্তি লাগবে।’
সাজেদ হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা ধরে। ঢকঢক করে সবটুকু শরবত পান করে নেয়। কিছুক্ষণ জিনাতের লক্ষ্মীমন্ত হাত দু’টির দিকে একদৃষ্টে মুগ্ধতা নিয়ে চেয়ে থাকে। হাত তো নয় যেন একজোড়া রক্ষাকবচ। ভেতর বাইরে থেকে পরম যতেœ পুরো সংসারটাকে যে দু’টি হাত আগলে রেখেছে।
‘জিনাত?’
‘বলো।’
‘জিনাত, আমি এক্ষুনি আসছি’Ñ এই বলে হঠাৎ বেরিয়ে পড়ে সাজেদ।
লালমাই,কুমিল্লা


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme