২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এখনো চোখে ভাসে বন্ধু তোমার ছবি

-

বাবা নেই। মা-ই মানুষ করেছেন মুসাকে। সংসারের টানাপড়েনের জন্য মুসার কষ্ট করতে হতো প্রচুর। মুসা পরের ক্ষেতে কামলা দিত, মাটি কাটত, কখনো কখনো আবার ভ্যান ভাড়া করে নিয়ে ভ্যান চালাত। অসাধারণ মেধাসম্পন্ন মুসা সবার সাথে নম্্র ভাষায় কথা বলত। হাসিমুখে সবার সাথে মিশলেও মাঝে মধ্যে নীরবে নির্জনে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবত মুসা। অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন ও সহজ-সরল আচরণ, নম্রভদ্র অমায়িক মানসিকতাসম্পন্ন মুসার প্রশংসায় স্কুলের স্যারেরা সর্বদা ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মুসার অসাধারণ মেধার ঝলক দেখেছিলেন স্কুলের স্যারেরা।
ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে সপ্তম শ্রেণীতে ওঠার সময় বরাবরের মতো ক্লাসের প্রথম তো হলোই এবং পুরা স্কুলের মধ্যে সবার থেকে বেশি নম্বর পেয়ে সর্র্বোচ্চ নম্বর পাওয়ার গৌরব অর্জন করে তাক লাগিয়ে দিলো সবাইকে। সপ্তম শ্রেণীতে উঠে সপ্তাহ দুয়েক পরের কথা। হঠাৎ করে দুই দিন কি তিন দিন মুসা স্কুলে এলো না।
সেদিন স্কুলের ঢুকেই কেমন যেন লাগছিল। কেমন যেন স্কুলটাকে খুব ভার ভার লাগছিল। কেমন যেন চুপচাপ পুরো স্কুল। ঘণ্টা পড়ল। লাইব্রেরির সামনে সবাই জড়ো হলাম। সব স্যারের চোখেমুখে কেন জানি বিষণœতার ছায়া। কেন জানি মনে হচ্ছিল একখণ্ড কালো শোকের ছায়া এসে পড়েছে সবার মুখে। সেদিন আর কমান্ড, শপথ, জাতীয় সঙ্গীত কোনোটিই হলো না।
হেড স্যার বক্তব্য শুরু করলেন। হেড স্যারের সেদিন বক্তব্যটা আজ আমার কাছে বড় ইতিহাস লাগে।
স্যার বলেছিলেনÑ
এই দুনিয়া ক্ষণকালের স্থান। এখানের সবই ক্ষণস্থায়ী। যার শুরু আছে তার যেমন শেষ আছে। ঠিক তেমনিভাবে যার জন্ম আছে তার মৃত্যু অবধারিত। ‘কুল্লু নাফসিন জাইকাতুল মাউত’Ñ মানে প্রত্যেক প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। মুরব্বি দাদা-দাদীদের মুখে শুনেছি তারা বলতেন জন্মাইলে মরতি তো একদিন হবেইÑ এটাই স্বাভাবিক। মনে করো আমি এখন তোমাদের হেড স্যার। তোমাদের সামনে দাঁড়িয়ে এখন জোরেশোরে কথা বলছি তোমাদের দেখতেছি এই আমিও একদিন চলে যাবো। ছিন্ন করে সব মায়ার বাঁধন। কথাগুলো শেষ করবার আগেই দেখলাম লুকিয়ে স্যার তার চোখের অশ্রু মুছলেন। অন্য স্যারেরাও নীরবে কেঁদেছিলেন সেদিন। হেডস্যারের বক্তব্য শেষ হলে মাওলানা স্যার মানে যাকে ওস্তাদজি বলেই চিনতাম সবাইÑ উনি হাদিসের আলোকে কিছু কথা বললেন। কথার একপর্যায়ে ওস্তাদজি বলে ফেললেন মুসার মৃত্যুর কথা। মুসার মৃত্যুর সংবাদে সবার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলল সবাই। স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক বললেন মুসার বিদেহি আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তিন মিনিট নীরবতা পালন করি সবাই। মুসার সব স্মৃতি চোখের সামনে জ্বল জ্বল করে ভেসে উঠছিল তখন। এই তো সেদিন টিফিনে এক সাথে বুট কিনে খেলাম। কত হাসি রহস্য করলাম। নীরবতা শেষ হলে স্কুল ছুটি ঘোষণা করা হলো। ছুটে গেলাম মুসাদের বাড়ি। মুসার মৃত্যুসংবাদ কেমন যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। না, এটা হয় না। মুসা এটা করতেই পারে না। কেন এমন হলো? কোথাও বোধ হয় সবার ভুল হচ্ছে।
মুসাদের বাড়ির সামনে মানুষের ভিড়। বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছে কান্নার আওয়াজ। বারান্দায় শুয়ে আছে মুসা। মাথার দুই পাশে জ্বলছে আগরবাতি। টান টান হয়ে শুয়ে আছে মুসা। একটুও নড়ছে না মুসা। আমরা কত মানুষ গেলাম ওদের বাড়ি কিন্তু মুসা একটিবারের জন্যও বলছে না Ñ তোরা এসেছিস বসেক। বারান্দায় উঠে আয়, বস। স্কুলে কয়টা ক্লাস হয়েছে। ইংরেজিতে কী পড়া দিছে স্যার।
স্কুলের কত স্যার গেলেন মুসাকে দেখতে। মুসা একটিবারের জন্যও স্যারদের সাথে কথা বলল না। ফিরেও দেখল না স্যারদের দিকে। সবাই বলছিল মুসা নাকি আমাদের ছেড়ে চলে গেছে অনেক দূরের দেশে। না ফেরার দেশে।
মুসাকে বরইপাতা গরম পানি দিয়ে গোসল করানো হলো। কাফনের কাপড় পরানো হলো। খাটিয়ায় করে নেয়া হলো কবরস্থানে। চোখের সামনে মুসার দাফন হলো। মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া হলো মুসার সোনামুখটা।
পৃথিবীর সব মায়ার বাঁধনকে হেয়প্রতিপন্ন করে চলে গেল মুসা। তবুও মন বলতÑ হয়তো একদিন স্কুলে গিয়ে মুসার সাথে দেখা হবে। হয়তো একদিন ক্লাস চলাকালীন বই হাতে মুসা এসে দাঁড়াবে ক্লাস রুমের দরজায়। বলবে, স্যার আসব। রুমে ঢুকে সামনের বেঞ্চে আমাদের পাশে বসবে মুসা। ক্লাস করবে গল্প করবে।
স্কুলজীবন শেষ হলো, শেষ হলো কলেজজীবন, তারপর শেষ হলো ছাত্রজীবন কিন্তু হায়... অজানা অভিমানে চলে যাওয়া মুসা আর কোনো দিন ফিরে এলো না। হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে রাখা অভিমানের কথা বলে গেল না কাউকেই।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে কত কী-ই না পেলাম জীবনে। পেলাম কত বন্ধুবান্ধব, পেলাম কত নতুন মানুষ নতুন জায়গা। কিন্তু তোর জায়গাটা যে আর কেউ পূরণ করতে পারল না মুসা। আজও যে হৃদয়ের মণিকোঠায় তোর ছবি বারবার ভেসে ওঠে। ভেসে ওঠে তোর চাঁদমুখখানি। ভেসে উঠে ব্লু কালারের জামা আর সাদা সোল্ডারের মুসার ছবি।
যেখানে থাকিস ভালো থাকিস। খোদা তোকে যেন ভালো রাখেনÑ সেই দোয়াই রইল। ভালো থাকিস মুসা। ভালো থাকিস।
শালিখা, মাগুরা


আরো সংবাদ