২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

এমন বর্ষার দিনে

-

ক্রমাগত দিনভর ঝরেই যাচ্ছে টুপটাপ। এবার বুঝি কেউ নেমন্তন্ন করেছে তেনাকে। তিনি ঝরছেন তো ঝরছেন। পড়ছেন তো পড়ছেনই। বৃষ্টির এমন অবিরাম ধারাপাতে আমার হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কখনো অসহ্য লাগছে ঠিক তবে বেশির ভাগ সময় এক অদ্ভুত আনন্দ দিয়েই কাটছে এ ক’টা দিন। একধারে রবীন্দ্র্রনাথের ‘আজ ঝড় ঝড় বাদল দিনে’ বেজে যায় নিরন্তর। তার ঠিক পাশেই জানালা ধরে দাঁড়িয়ে থাকি নিশ্চুপ। ভাবি! ভাবতেই থাকি আমার গত হওয়া দিনকাল। পুরনো স্মৃতির খাতিয়ান ঘেঁটে দেখি আস্তর পড়ে আছে সেখানে। তবুও মিটমিট জেগে আছে সেই প্রেম। বৃষ্টি-মেঘের দুর্দম লুটোপুটি মেখে কোথায় যে হারিয়ে যেতাম শৈশবে!
কালি ডাক্তারের আম বাগান আর ঘরের পেছনে শিউলীদের পেয়ারা গাছ ছিল আমার দস্যিপনার জায়গা। একবেলা বান ডাকলেই হলো, দিতেম একছুট। সোজা বাগানে। ডাক্তারের নাতনি সুলেখা একটি মস্ত ডাইনি। অমন লিকলিকে লম্বা শরীরের মেয়েটি যেন কথার দণ্ড নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে দুয়ারে। মনে হতো ভূতটুত কিছু একটা হবে ও। নইলে যখনই যেতাম ওই দেখে ফেলত। কী গলার স্বররে বাবা। একদম পিলে চমকে যেত। দেখলেই বলত, ‘এই বাঁদড়’ আবার এসেছিস! একদম নাক চটকে দেবো, যা ভাগ এখান থেকে।
আমিও কি কম ত্যাঁদড়। দিতেম এক ভেংচি। তারপর কোঁচড় গুজে ভোঁদৌড়।
এরপর গোসাইদের পুকুরপাড়। নীরু, মজিদ, দীপন আর বাবু মিলে গোসলের নামে এক দুপুর ঝাঁপাঝাঁপি, লাফালাফি। পুকুরে বৃষ্টি পড়ে কেমন উষ্ণ হয়ে উঠত তার জল। মাঝে মধ্যে মেঘ গুরুম করে বজ্রপাত পড়তেই ডুব দিয়ে পানির তলে লুকোনোর ভয়। এ কি আর পাচ্ছে একালের ছেলেপুলেরা। আহা! সে কি দিন। শৈশবের সোনালি সুতোয় গাথা চকচকে সময়। উচ্ছ্বাস, চঞ্চলতা নিয়ে ছুটে চলা মাঠ ডিঙিয়ে মাঠ। বিলের পর বিল। নদী-খালে ডুব মেরে এপার ওপার।
ঠাকুরবাড়িতে আমার যে বন্ধুটি ছিল টোকন। সারা দিন শুধু দাওয়ায় বসে হাওয়া খেত। পড়াশোনা আর কী! আদর্শলিপি শেষ করতেই বন্ধুটি আমার গিলে খেয়েছে ক’বছর। তবে ওর মনটা ছিল একদম সাদা। অমন মায়া ভরা ছেলে ঠাকুরবাড়িতে একটিও ছিল না আর। তাই ভাবও ছিল ওর সাথে আমার গলায় গলায়। বৃষ্টি নামতেই চলে আসত আমাদের বাড়ি। বলত! এই নেমে আয়, নেমে আয়! ভগবানের আশীর্বাদ পড়ছে। আমিও কি আর ঘরে থাকি তখন। বলতাম যিনি দিচ্ছেন ইনি তোদের ভগবান টোকন। আমাদের কিন্তু আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের বৃষ্টি দেন। বলতে বলতে এক লাফে উঠোন পার। চলে যেতাম বৌশের বাড়ির মহাসড়কে।
বারৈপাড়া থেকে সিদ্ধেশ্বরী পর্যন্ত এই রাস্তাটি একদম নতুন। দু’ধারে কড়ই আর মস্ত বটগাছের সারি। বড়দের কাছে শুনতাম এই রাস্তার শেষ মাথা নাকি মুন্সীগঞ্জ হয়ে এক্কেবারে ঢাকা শহরে গিয়ে মিশেছে। ওসব আমাদের ভাবনায় নেই। শুনতামই যা। আমি আর টোকন যেতাম সবুজ দেখতে। বৃষ্টিতে ভিজে কড়ই আর বটপাতাগুলো কি যে সবুজাভ হয়ে যেত! একি আর লিখে বোঝাতে পারি!
আহ! ভিজে পাতা থেকে টুপটুপ জল। কে ক’টা হাতের তালুতে নিতে পারে এ হলো আমাদের খেলা। টোকন বলত জানিস তপু! আমার না এই জল খেতে মিষ্টি লাগে। ওর এমন কথা শুনে আমার বড্ড হাসি পেত তখন। ধুর বোকা! এই জল আবার মিষ্টি হয় নাকি। তুই একটা বুদ্দু। যা ধর দেখি, ওই চার নাম্বার গাছের এই ফোঁটাটা। বলতেই সারা। মুহূর্তেই টোকন চলে যেত। বেশির ভাগ নিতেও পারত ও। এভাবে ক্রমাগত জলটুপ ধরে আমরা ক্লান্তও হয়ে যেতাম বুঝি একসময়। কিন্তু ভালো লাগা কমত না সামান্যও।
এই বৃষ্টিই কি না ছিল আমাদের আশীর্বাদ। টোকন বলত বৃষ্টিতে ওর মন ভালো হয়। ওর হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে মেঘের ভেতর। দূরে কোথাও। খুব দূরে! খুব দূরে! আর কোনো শব্দ ছিল না আমাদের, যা এর থেকেও অনেক মাইল দূরে, অদূরে নিয়ে যাবে আমাদের ভাবনাকে।
এভাবেই বিকেল পড়ে যেত। মেঘে সূর্য দেখতাম না ঠিক তবে আঁধার নেমে আসত আবছা আলোয়। ঝুমঝুম বৃষ্টিতে টোকন আর আমি ফিরে আসতাম। সেই বারৈপাড়ার পথ ধরেই। শুনেছিলাম এই রাস্তা নাকি ঢাকা শহরে গিয়ে মিশেছে।

 


আরো সংবাদ