২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বিশ্বাস ঘাতক : চারাগল্প

-

এই দূর কাতার প্রবাসে যখন খুব একাকিত্বে ভুগি, তখনই ফেসবুকটা আমার মন ভালো করে দেয়। দেশ থেকে যাদের ছেড়ে এসেছি একদিন, তাদের সবাইকে এখানে পাই। কে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কী ভাবছেÑ সবই জানিয়ে দিচ্ছে এই ফেসবুক।
এখানে একদিন পেয়ে যাই আনিসকে। আমার বাল্যবন্ধু। শৈশবে আমরা জবর বন্ধু ছিলাম। জীবনের নানান মোড়ে এসে মাঝখানে বাড়ে দূরত্ব। এক বর্ষার দুপুরে হাট থেকে বাড়ি ফিরে দেখি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অঘটনটি ঘটে গেছে। ঘরের চালে বজ্রপাত হয়ে মারা গেলেন বাবা, মা আর রোজী আপা। সবাইকে হারিয়ে আমি হলাম এতিম।
ছোট মামার সহায়তায় এলাম এই কাতার শহরে। আজ দশ বছর এখানেই আছি।
ফোন কলে আনিসের সাথে কথা হয়। বাংলাদেশে যাওয়ার আহ্বান করে বলেÑ ‘ফিরে আয়। বিয়ে করে সংসার পাত। বউ বাচ্চা হবে। বিদেশে ইনকাম করে কার জন্য খরচ করবি?’ আনিসের কথা শোনে আমি হাসি। বিয়ে! আমার মতো সর্বহারাকে বিয়ে করবে কে?
কিন্তু আনিস আমায় আশার বাণী শোনায়। নার্গিসের গল্প বলে। নার্গিস নাকি আনিসের ফেসবুকে আমার ছবি দেখে মুগ্ধ। এসব শোনে আমি আয়নার ভেতরে আমার ছবির দিকে তাকাই। না, আমার চেহারা খারাপ নয়। হাজার হাজার মাইল দূরে বাংলাদেশের নার্গিস এই চেহারা দেখে মুগ্ধ হয়।
নার্গিসের ছবি চাই আনিসের কাছে। আনিস ম্যাসেঞ্জারে নার্গিসের ছবি দিতেই আমি অবাক। এ তো ফুলপরী।
ফুলপরীকে আমার পছন্দ হয়েছে। তাকে বিয়ে করতে চাই। আনিসকে জানাই। আনিস হাসে। তার মামাতো বোন নার্গিসকে আমার মনের কথা জানিয়ে দেয়। নার্গিস নাকি রাজি!
প্রতিদিন মেসেঞ্জারে নার্গিসের একটি করে ছবি পাই। আনিস পাঠায়। প্রতিটি ছবিতে নার্গিসকে অপরূপ লাগে। আনিসের কাছে রোজ নার্গিসের গল্প শোনে শোনে একদিন তার মোবাইল নাম্বার চাই। আনিস জানায় নার্গিস মোবাইল ব্যবহার করে না। অভাব-অনটনের সাথে বেড়ে ওঠা নার্গিসের নাকি মোবাইলের প্রতি আকর্ষণ নেই। ওরা এমনিতে গরিব। তার উপর মোবাইলে টাকা ভরার ক্ষমতা নেই। অর্থের অভাবে নার্গিসের অনেক শখ-স্বপ্ন পূর্ণ হয় না। আনিসের মুখে এসব গল্প শোনে আমি আহত হই। সিদ্ধান্ত নিলাম নার্গিসের খরচের জন্য প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা পাঠাব। আনিস সে টাকা তুলে দেবে নার্গিসকে।
আমার সিদ্ধান্তে রায় দেয় আনিস। মাসের শেষের দিকে আমার পাটানো টাকা পেয়ে নার্গিস নাকি খুশি। একদিন আনিসকে বলি, ‘নার্গিসের সাথে একদিন কথা বলা যাবে?’ আনিস জানায়, ‘ওকে অনেকবার বলেছি, লজ্জা পাচ্ছে কথা বলতে। সমস্যা নেই, একদিন কথা বলিয়ে দেবো।’
সেই ‘একদিন’ এর অপেক্ষায় থাকি আমি।
নার্গিসের সাথে একটু কথা বলতে আমি অস্থির হয়ে উঠি। আনিস একদিন জানায় নার্গিসের একমাত্র ভাই শাওন রাজনৈতিক কোন্দলে জড়িয়ে পিটুনি খেয়ে হাসপাতালে। চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দরকার। এমন দুর্দিনে নার্গিসের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো দায়িত্ব ভেবে আনিসের মারফত নার্গিসের ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য ৫০ হাজার টাকা পাঠাই। নার্গিস নাকি খুবই কৃতজ্ঞতা জানালো।
২.
আমি গতকাল বাংলাদেশে এসেছি। আমাকে দেখে আনিস চমকে উঠবে। এমন চমক দেখাতে আনিসকে না জানিয়ে দেশে এলাম। বাবা, মা আর রোজী আপার কবরের দিকে তাকিয়ে নীরবে কাঁদলাম।
আনিস আমার সামনে। আকস্মিক আমাকে দেখে আনিস আকাশ থেকে পড়ল। এই অনেক বছরে আনিস একটুও বদলায়নি। দেখতে ঠিক সেই আগের মতো।
আমার হাতে বিদেশী প্রসাধনীভর্তি ব্যাগ। সব নার্গিসের জন্য। এমন গিফট পেয়ে নার্গিস কতই না খুশি হবে। লাজুক কণ্ঠে আনিসকে বলি, ‘চল নার্গিসের বাড়ি যাই।’ আনিস কোনো কথা বলছে না। তার কোনো ভাবান্তর নেই। আমাকে অবাক করিয়ে দিয়ে আনিস দৌড়ে এসে আমার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা করে দে রঞ্জু। আমি তোর সাথে নাটক করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছি। নার্গিস নামের কেউ নেই। ওই মেয়েটি ফেসবুকের এক ধনীর মেয়ে। ওর ছবিগুলো তোকে পাঠাতাম। আমাকে ক্ষমা কর।’
এ কোন সত্যের মুখোমুখি আমি। এতো বড় প্রতারণা করলো আনিস! আমার বন্ধু! না না, এই প্রতারক আমার বন্ধু নয়। এ এক বিশ্বাস ঘাতক।
আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসি, নোয়াখালী


আরো সংবাদ