২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

শ্রাবণে ভেজা মন : চারাগল্প

-

শ্রাবণের স্নিগ্ধ মেঘের রিমঝিম বৃষ্টি দিনভর। ক্যাম্পাস ছুটির দিন একটু মজা করে ঘুমোচ্ছি হঠাৎ সুপ্তির ফোনÑ ‘তুমি কী করছ?’ এই সময় ঘুমোচ্ছি বললে নিশ্চিত বকা শুনতে হবে। তাই সত্যিটা চেপে ‘এই তো পড়ছি’। ‘দুপুরে খেয়েছ তুমি?’ হ্যাঁ-না করতে করতে সুপ্তি ঠিকই বুঝে ফেলল খাইনি এখনো। তা ছাড়া আমি দুপুরে কখন খাই ও খুব ভালো করেই জানে। সুপ্তি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে বললÑ ‘আমিও খাইনি এখনই টিএসসিতে আসো একসঙ্গে খাব দুইজন।’ এতক্ষণ চুপটি করে সব শুনে যাচ্ছিলাম আমি। এবার ফোন রেখে মানিব্যাগটা এপাশ-ওপাশ করে দেখি মাত্র ত্রিশ টাকা আছে। বার কয়েক চিৎকার করে আদিলকে ডাকলাম কোনো সাড়াশব্দ নেই ওর। আর বিরক্ত না করে ওর মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ঘুমঘুম ভাবটা কাটেনি তখনো তাই হলগেট থেকেই একটা রিকশা নিয়ে সোজা টিএসসির দিকে রওনা হলাম। শাহবাগ মোড়ে পৌঁছতেই রিকশাটা থেমে গেল। সামনে লক্ষ করতে কিছু লোকের ভিড় চোখে পড়ল। দাঁড়িয়ে না থেকে এবার হাঁটতে আরম্ভ করলাম। দৈবাৎ পকেট থেকে ফোনটা বের করে দেখি তেরোটা মিস কল। আরো দ্রুত পা ফেলতে লাগলাম। ওখানে পৌঁছে সুপ্তিকে দেখে তো আমি অবাক! ছন্নছাড়া হাসি মেখে বললামÑ ‘তুমি শাড়ি পরেছ? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না এটা।’ সুপ্তি খানিক রাগের ভণিতা মেখে বলে উঠলÑ ‘এই তোমার আসার সময় হলো? ঢঙ রেখে, তাড়াতাড়ি বসো খাবে।’ আমি হাতটা ধরে সুপ্তিকে ক্যাফেটরিয়ার দিকে নিয়ে যাচ্ছিলাম। সুপ্তি বলে উঠলÑ ‘কোথায় নিচ্ছ আমাকে?’ ‘চলো আজ ক্যাফেটরিয়ায় খাব।’ ‘জি না, আপনি বসেন।’ সুপ্তি কথাটা বলেই ব্যাগ থেকে এত্তগুলো বাটি বের করল। একটু মৃদু হেসে ছোট্ট বাবুর মতো খেতে বসে গেলাম আমি। ওই সব দিন আজ মনে হলে সান্ত্বনার বুকে মাথা রেখেও কেঁদে ফেলি। যেন চোখের কোণে নীরব অশ্রুরা এসে কষ্টের সঙ্গে লুটোপুটি খেলে। ওই টিএসসি, কার্জন হল, শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড়, বটতলা, সমাজবিজ্ঞান চত্বর, হাকিম চত্বর, ভিসি চত্বর, ফুলার রোড, পলাশী, শহীদ মিনারে হাত ধরে দু’জন কত সকাল-সন্ধ্যা পার করেছি। রাতের পর রাত স্ট্রিট লাইটের নিচে বসে দু’জন গল্পে মেতেছি। দিনের পর দিন স্বপ্ন বুনেছি ছোট্ট একটি সংসার পাতার। দেখতে দেখতে জীবন থেকে ওই সোনালি দিনগুলো ফুরিয়ে গেল।
আজো সুপ্তির নম্বর থেকে ফোন আসে কিন্তু আমি রিসিভ করি না। শুধু নম্বরটার দিকে নির্নিমেষ চেয়ে থাকি। সুপ্তি একটু কথা বলার জন্য মাঝে মধ্যে অপরিচিত নম্বর থেকেও ফোন দেয়। যেন আমি ফোনটা রিসিভ করি। একটু কথা বলি ওর সঙ্গে। এই তো সে দিন ফোনটা রিসিভ করতেই অপরিচিত একটা কণ্ঠ ভেসে এলো; ‘হ্যালো, ভালো আছেন?’ আমি নিচু গলায় উত্তর দিলাম জি ভালো আছি কিন্তু আপনাকে ঠিক মনে করতে পারছি না। ‘আমাকে আপনি চিনবেন না তবে আমি আপনাকে চিনি। সুপ্তির সঙ্গে আমাদের ডিপার্টমেন্টে কয়েকবার দেখেছি আপনাকে।’ হঠাৎ খানিক চমকে গেলাম আমি তবুও না বোঝার ভণিতা মেখে বললামÑ ‘মনে হয় আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে’ এতটুকু বলেই তাড়াহুড়ো করে ফোনটা রেখে দিলাম।
ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে এসেছি আজ দুই মাস হয়ে গেল। নিয়তি আমাদের জন্য অপেক্ষা করল না। সেই ফেলা আসা স্মৃতিগুলো মনে পড়লে গাল বেয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে। হঠাৎ ভাইব্রেশন রাখা ফোনটা কেঁপে উঠল। দেখি ওই নম্বরটা থেকে মেসেজ এসেছে। ‘ক্যাম্পাস ছাড়লে একদম আমাকে কিছু না জানিয়েই। তুমি জানো? আজো মায়াবী সন্ধ্যা নেমেছে। যদিও আমি সেটা উপলব্ধি করতে পারছি না। আজ হারিয়ে গেছে আমার অনুভব, তলিয়ে গেছে আমার অনুভূতি। টবে দোলনচাপা ফুল ফুটেছে। একটু পরই নেমে পড়বে রাত। রাতভর জ্যোৎস্নারা জাগবে। থাকবে মিটিমিটি তারকাদের লুকোচুরি। জোনাকি পোকারা আঁধারে হাবুডুবু খেলবে। ঝিঁঝি পোকারাও ডেকে যাবে তানপুরার সুরে। নিশুতি রাতে দূর ঝোঁপের আড়াল থেকে ভেসে আসবে ডাহুকের ডাক। হিজল বনে ফুটবে হিজল, তেমনি তমাল বনে তমাল। শ্রাবণ মেঘেরা নিমন্ত্রণ করে আনবে টিপটিপ ঘুমের বোল। শুধু ওবেলা থাকবে না তুমি। তুমি ছাড়া আজ আমার পৃথিবী।’
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া


আরো সংবাদ