১৭ নভেম্বর ২০১৮

অসহায়ের বন্ধু রাসেল

সপ্তাহে এক দিনের আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেলের স্কুলে লেখাপড়া শিখছে পথশিশুরা -

মোটরবাইকে তরুণ কলেজ মাঠে ঢোকে। তাকে দেখে পথশিশুরা চিৎকারে স্লোগান তোলে ‘রাসেল ভাই, রাসেল ভাই’। চিৎকারে অনুরণন হয় ‘রাসেল ভাই’ ধ্বনির। জড়ো হয় ১০-১২ জন পথশিশু। সবার কণ্ঠে এই নাম। ঘিরে ধরে বাইকের তরুণকে। কেউ ওঠে বাইকে, ধরে হাতলে, গ্লাসে, কেউ আবার নরোম হাত রাখে তরুণের হাতে। চলে নানা আবদার। বিচিত্র আবদার তাদের। দূর থেকে ‘মনভালো’ করা দৃশ্য দেখে কাছে গেলাম। কথা, গল্প, আড্ডায় তার সাথে সময় কাটালাম।
আবদুল্লাহ আল মামুন রাসেল। নরসিংদী রায়পুরার মাঝেরচরের ছেলে। ২৭ বছরের টগবগে তরুণ। ছেলেবেলা থেকেই বাবা মায়ের সাথে থাকে নরসিংদী শহরের আবাসিক এলাকা ব্রাহ্মন্দীতে। ২০১৪ সালে ‘ব্যবস্থাপনা বিভাগে’ মাস্টার কমপ্লিট করেছে নরসিংদী সরকারি কলেজ থেকে। দুই মাস ধরে চাকরি করে সিলেট শহরের বিয়ানীবাজারে। মার্কেন্টাইল ব্যাংকে। চাকরির অবসরে বৃহস্পতিবার রাতের গাড়িতে ছুটে আসে নরসিংদীতে। শুক্রবার বেলা ৩টায় পথশিশুদের নিয়ে বসে নরসিংদী সরকারি কলেজের শহীদ মিনারের সামনে। দুই বছর ধরে প্রতি শুক্রবারের দৃশ্যটা এমন। পথশিশুরা ৫০-৬০ জন। ময়লা আধময়লা জামায় শিশুরা হেসে দুলে পড়ছে। শিখছে অক্ষরজ্ঞান ও গণনাসংখ্যা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ধারাবাহিকভাবে শোনাচ্ছে মুখস্থ ব্যঞ্জনবর্ণ। পড়া শোনানো শেষ হলে করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠছে তাদের পৃথিবী। ‘তাদেরকে কলেজে অসহায়ের মতো ঘুরতে দেখে আমার খারাপ লাগত। মানুষের কাছে হাত পাতলে দেখলে খারাপ লাগে। সবার যখন পড়ার সময় হয়, ইশকুলে যাওয়ার সময় হয়, তখনো তারা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে খাবারের তালাশে। তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের কথা চিন্তায় এনে, বন্ধুদের সাথে পরামর্শ করে তাদের জন্য বেছে নিলাম প্রতি শুক্রবার। তাদের পড়াতে লাগলাম সপ্তাহের এক দিন। এখন অনেকেই অক্ষরজ্ঞান চেনে। ছড়াও কাটতে পারে। তাদের পড়াতে আমার ভালো লাগে। তাদের মাঝে আমার প্রাণ ফিরে পাই’, বলেন রাসেল।
দুই বছর ধরে নিজের বার্থডে পালন করে তাদের সাথে। কেক কাটে পথশিশুরা । খায় এবং খাইয়ে দেয়। আনন্দটা তাদের সাথে ভাগাভাগি করে। তারাও বিভিন্ন ফুল নিয়ে আসে রাসেল ভাইয়ের জন্য। গিফট করে। ভালোবেসে গ্রহণ করে রাসেল। পথশিশুদের নাহিদ বলেÑ ‘রাসেল ভাই আমাদের ভাই। আমাদের অনেক আদর করে। ভালো মানুষ। ক, খ পড়ার। জামাকাপড় দেয়। পড়া শিখলে চিপ্স দেয়। অনেক মজার বড় কেক খাওয়া।’ ১০ বছরের মেয়ে সুইটি পরনের কাপড় দেখিয়ে বলে, ‘এই কাপড়টা রাসেল ভাই দিছে। অনেক ভালা মানুষ। পড়তে কয়। আমি তারে ফুল দিছি হিদিন। আল্লাহ তারে মাথার চুল পরিমাণ বাঁচাক।’
অন্যের কাছে হাতপাতা বন্ধে কাজ করছেন পথশিশুদের নিয়ে। তাদেরকে বুঝাচ্ছেন। কারো জন্য ব্যবস্থা করছেন কর্মক্ষেত্র। খালপাড়ের ছেলে নীরব মানুষের কাছে সাহায্য চাইত। রাসেল একদিন তাকে ডেকে কাছে নিয়ে ভিক্ষা বন্ধ করতে বলেন। ‘ভিক্ষা না করলে কী খাবো’ উত্তর দেয় সে। তখন রাসেল তাকে নিজ হাতে বোল ও দুই শ’ টাকার চানাচুর কিনে ফেরি করতে পাঠিয়ে দেন। নীরব ভিক্ষাবৃত্তি ছেড়ে দিয়ে এখন গাড়িতে ও স্টেশনে চানাচুর বানিয়ে বেচে। এমনই গল্প আছে হৃদয় দাস (১০) নামে এক বাদামওয়ালার সাথে।
‘সরকারি কলেজে আমরা খেলছিলাম। খেলার অবকাশে দাঁড়িয়ে আছি অনার্স ভবনের সামনে। একজন মহিলা এসে ছন্নছাড়া মানুষের মতো তার সামনে দাঁড়ালেন। সে মহিলাকে ৫০ টাকা দিলে মহিলা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলেনÑ বাবা, আমার মেয়েটা ডায়াবেটিক হাসপাতালে ভর্তি। তার দুই ব্যাগ রক্ত লাগে। তুমি আমার মেয়েটারে বাঁচাও। রাসেল ছুটলেন। বন্ধুদের ফোন করে ম্যানেজ করেন রক্ত। পরিশোধ করে দেন হাসপাতালের বকেয়া।’ বলেন বন্ধু উৎপল।
রাসেল স্বেচ্ছায় ৪০ বারের বেশি রক্ত দিয়েছেন। স্বেচ্ছায় রক্তদানে সেরা হয়েছেন নরসিংদীতে। সম্মাননা পেয়েছেন ফেমাস ইনস্টটিউশন থেকে। রাসেল বলেনÑ ‘রক্ত দিতে ভালো লাগে। মনে শান্তি লাগে। রক্তগ্রহীতার মাঝে নিজেকে খুঁজে পাই। তার মুখের হাসি আমাকে সাহসী করে। তার দুআ আমাকে প্রেরণা জোগায়। ভালোবাসা এবং ভালো লাগার জন্য রক্ত দেই।’
২০১৩-এর ঈদুল ফিতর। বাবা কিছু টাকা দিলেন ঈদের শপিং বাবদ। ভগ্নিপতির সাথে সাক্ষাৎ করতে নরসিংদীর ইউএমসির মাদরাসায় যান। সেখানে দেখা হয় কিছু এতিম শিশুর সাথে। তাদের জন্য কিছু করতে মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে তার। ভগ্নিপতির সাথে পরামর্শ করে কিনে আনেন পাঞ্জাবি-পায়জামা। বলেন, ‘নিজের শপিং বাদ দিয়ে তাদের জন্য তৎক্ষণাৎ বাজার থেকে পাঞ্জাবি ও পায়জামা এনে পরিয়ে দেই। নিজের ঈদ কাটিয়ে দেই পুরনো একটা টি-শার্ট পরে।’
অভাবে উপযুক্ত মেয়ের বিয়ে হচ্ছে না শুনলে রাসেল ছুটে যান। সাধ্যমতো খরচ করে বিয়ে দেন।
গোষ্ঠু লাল দাসের মেয়ে নীতি দাস। আজ পাঁচ বছরের মেয়ে। ইশকুলে যায়। সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে। বাবা-মাকে ডাকে গালভরে। হাসলে গালে টোল পড়ে। বাবা-মা তার দিকে তাকিয়ে অবাক হয়। তার বেঁচে যাওয়া দেখে ভগবানের কাছে মাথা নত করে। হৃদয় থেকে আশীর্বাদ করে রাসেলের জন্য। নীতিদাস জন্মেছিল হার্টে ছিদ্র নিয়ে। ডাক্তারের শরণাপন্ন হলে বেঙ্গালুরুতে নিয়ে যেতে এবং বাংলাদেশে তার চিকিৎসা হবে না জানান। টাকা প্রয়োজন ৪ লাখ। নইলে বাঁচানো অসম্ভব। বেকার বাবার মাথায় তখন আকাশ ভেঙে পড়ে। নিজের জমিনও নেই বিক্রি করে মেয়ের চিকিৎসা করার মতো। দিনরাত কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করেন। আর অবুঝ মেয়ের দিকে তাকিয়ে থ মেরে বসে থাকেন। রাসেল খবর পেয়ে ছুটে যান গোষ্ঠু লাল দাসের কাছে। তাকে আশ্বস্ত করেন। ভরসা দেন। বলেন, ‘আপনি চিন্তা করবেন না দাদা। আপনার মেয়ের চিকিৎসা হবে। আপনি বেঙ্গলুরু যাবেন। প্রস্তুতি নেন।’ রাসেল নেমে পড়েন মানুষের মাঝে। কাগজে বক্স বানিয়ে হাত পাতেন মানুষের দরবারে। ছুটে চলে স্কুলে স্কুলে। বন্ধুদের নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় করেন ক্যাম্পিং। ঢুঁ মারেন বড়লোকের বাড়ি। নীতিদাসের জীবনের জন্য চান ভিক্ষা। তাকে সঙ্গ দেয় বন্ধু মেহেদী হাসান রিয়াদ, আবু সাইদ, আল আমীন, ওমর ফারুক, টুম্পা স্নিগ্ধা ভৌমিকসহ অনেকে। তাদেরকে হেল্প করে নরসিংদী চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মামুন। নীতির বাবার হাতে তুলে দেন চার লাখ টাকা। চার মাস বয়সী নীতিকে পাঠানো হয় নারায়ণ হৃদয়ালয়া হাসপাতাল বেঙ্গালুরু, ভারতে। ডা. দেবী শেঠির তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা হয় নীতির। চিকিৎসা শেষে নীতিকে নিয়ে দেশে ফেরা হয়। ডাক্তার বলে দেন আবার দুই বছর পরে যেতে। আবারো প্রয়োজন চার লাখ টাকা। রাসেল ভরসা দেন। তারা মাঠে নামেন। টাকা তুলে আবারো পাঠান বেঙ্গালুরুতে। সফলভাবে নীতির অপারেশন হলো। নীতি এখন স্কুলে যায়। পড়াশোনা করে। গোষ্ঠু লাল দাস বলেন, ‘আমার মেয়ে হার্ট অপারেশনে ডাক্তার বেঙ্গালুরু যেতে বললে আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। চার দিকে অন্ধকার দেখি। আমি, আমার স্ত্রী সবাই কাঁদি। আর বাবা ডাক শুনব না মনে হলেই কান্নায় ভেঙে পড়ি। একদিন রাসেল আমার বাসায় আসেন। আমাকে ভরসা দেন। আমাকে নিয়ে যান আবেদ টেক্সটাইলের মালিক মামুন ভাইয়ের কাছে। মামুন ভাই রাসেলের হাতে বিষয়টা ছেড়ে দেন। রাসেল নরসিংদীর রাস্তায় নেমে পড়েন। স্কুলে স্কুলে যেতে লাগল। এক মাসের মধ্যে আমাকে চার লাখ টাকা ম্যানেজ করে দিলো। দ্বিতীয় বারও তিনি আমাকে টাকা ম্যানেজ করে দেন। আমি হিন্দু মানুষ। উনি মুসলিম। কিন্তু রাসেল আমার আপন ভাই। রাসেলের কথা ভোলার মতো না। রাসেলের কথা বেঁচে থাকতে আমি ভুলব না। তার জন্য আজ আমি বাবা ডাক শুনতে পাই।’
মাদক নির্মূলে চেষ্টা করছে রাসেল। কেউ নেশার জগতে ঢুকে গেছে জানতে পারলে তার পেছনে কৌশলে কাজ করে। তাকে সময় দেয়। তাকে বন্ধু বানিয়ে নিয়ে আসে আলোর পথে। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতাগড়তে প্রকাশ করেছে ম্যাগাজিন। মাদক সংখ্যা । লাইব্রেরির জন্য সংগ্রহ করছে বই। ৮০০ বই সংগ্রহে আছে রাসেলের।
নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ, ভাষাবিদ, গবেষক, লেখক প্রফেসর কালাম মাহমুদ বলেন, ‘রাসেলকে আমি ভালো জানি। সে প্রগতিশীল। সাংস্কৃতিক ও সেবামূলক কাজ করে। সে পথশিশুদের অক্ষরজ্ঞান শেখানোর কর্মসূচি নিয়েছে। মানুষের সেবা করে। তার কাজকে আমি সমর্থন করি।’


আরো সংবাদ