১৮ নভেম্বর ২০১৮

হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখির বাসা

-

কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছ। সেই সাথে বিপন্ন হচ্ছে বাবুই পাখির নিরাপদ আশ্রয়। তাই তো দেখা মেলে না শৈল্পিক সৌন্দর্যের প্রতীক বাবুই পাখির। ছোটবেলায় অনেক বড় তালগাছ দেখেছি, দেখেছি অনেক বাবুই পাখির বাসা। কিন্তু তা আর টিকে নেই।
ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার শিবানন্দপুর গ্রাম। এই গ্রামের কৃষক জাকিরের পাটক্ষেতের আইলে দাঁড়িয়ে আছে একটি তালগাছ। ৩০ হাত লম্বা এই গাছে প্রায় ১০০ বাসা বেঁধেছে বাবুইয়ের দল।
সারাক্ষণ তালগাছটি মুখরিত হয়ে থাকে বাবুই পাখির কোলাহলে। বলতে পারেন, একান্নবর্তী একটা পরিবার তাতে বাসা বেঁধেছে। রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে একটুও দমছে না তারা। বাবুই পাখি যদি নগরায়ন বুঝত, তাহলে মনে হয় ভালোই হতো। ঝড়-বৃষ্টিতে আর প্রতিকূল পরিবেশে না থেকে চড়ই পাখির মতো অট্টালিকায় থাকতে পারত। কিন্তু তাতে ওদের স্বকীয়তা যে নষ্ট হবে সে কথা কবি রজনীকান্ত সেন তার ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতায় লিখেছেন। সেই সাথে শিল্পের বড়াই তো আছেই। আর এই পঙ্ক্তি না বললে যেন তাদের স্মরণ করাই হবে না;
‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলেছে চড়াই
কুঁড়েঘরে থেকে করো শিল্পের বড়াই’।
হ্যাঁ, এই বাবুইকে বলা যেতে পারে সৃজনশীল কর্মী, শিল্পী ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীকও।
দেশে প্রধানত তিন প্রকার বাবুই থাকলেও দেশী বাবুই (যা দেখতে ছোট চড়ুইয়ের মতো) এর সংখ্যাই গণনযোগ্য। বাবুই আকারে সাধারণত ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়। এদের প্রজননঋতু এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস। আর এ সময় এদের বেশি দেখা যায়। বাবুই পাখি বাসা বুননে খুবই দক্ষ। তাই তো ইংরেজিতে এদের বলা হয় (নধুধ বিধাবৎ)। প্রজনন মওসুমে একটা পুরুষ বাবুই দুই-তিনটা বাসা বানায়। স্ত্রী বাবুই তার ইচ্ছেমতো যে পুরুষ বাবুইয়ের বাসা পছন্দ হয়, সে বাসায় প্রবেশ করে এবং জোড়া বেঁধে ডিম পাড়ে। এই মওসুমে পুরুষ বাবুইয়ের গলা খয়েরি, মাথা-বুক হলদে হলেও স্ত্রী বাবুইয়ের দেহের রঙ পরিবর্তন হয় না। এরা ডিম পাড়ার স্থানে যে নরম ধুলার আস্তরণ দিয়ে রাখে তার প্রমাণও পেলাম তালগাছটির নিচে পড়া বাসা থেকে।
এক মওসুমে বাবুই দুই থেকে চারটি ডিম পাড়ে। আর বাচ্চা ফুটতে সময় লাগে দুই থেকে তিন সপ্তাহ। মজার তথ্য হলোÑ বাবুই পাখি জোনাকি ধরে বাসার দেয়ালের নরম কাদায় আটকে রেখে রাতে আলোর চাহিদা মেটায়।
এদের ঠোঁটের আগার দিকটা সরু হওয়ায় এরা শস্যদানা খেতে বেশ পটু। এ ছাড়া কাউন, ছোট কীট এদের খাদ্যতালিকার অন্যতম। বর্ষা মওসুমে কৃষক যখন মাঠে ধান বুনে, বাবুই পাখি দল বেঁধে তাতে ভূরিভোজ করে। কৃষিবিদ আশরাফুল ইসলাম জানালেন, কৃষিজমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ, ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে তাল-খেজুরগাছের ব্যবহারেই বিপন্ন হচ্ছে বাবুই পাখি।
সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর

 


আরো সংবাদ