০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

বাস চলছে না কোথাও বাড়ছে ভোগান্তি

বাস চলছে না কোথাও বাড়ছে ভোগান্তি - ছবি : সংগৃহীত

অঘোষিত বাস ধর্মঘট চলছেই। পণ্য পরিবহন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও রাজধানীসহ সারা দেশে বাস-মিনিবাস গতকাল বৃহস্পতিবারও তেমন চলেনি। কোনো কোনো জেলায় বাস একেবারেই চলেনি বলে জানা গেছে। পরিবহন শ্রমিকদের অঘোষিত এ ধর্মঘটে মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। কোনো কোনো এলাকায় দু-একটি বাস নামলেও তা চলাচলে বাধা দেন শ্রমিকরা। ফলে মানুষ যাতায়াতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

মালিক-শ্রমিকরা বলেছেন, সড়ক পরিবহন আইন সম্পর্কে চালকদের তেমন কোনো ধারণা নেই। এর সাথে যোগ হয়েছে আতঙ্ক। যে কারণে চালকরা গাড়ি চালাতে চান না। আর ট্রাক-কাভার্ডভ্যানসহ পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত যানবাহন সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আশ^াস পাওয়া গেলেও যাত্রী পরিবহনে নিয়োজিত বাস-মিনিবাস সম্পর্কে সরকারের কোনো বক্তব্য এখনো না পাওয়ায় চালকদের মধ্যে ভীতি কাজ করছে। বাস-মিনিবাসসহ অন্যান্য পরিবহনের ক্ষেত্রে রাজধানীসহ সারা দেশে নতুন আইনে শাস্তি প্রদানও চলছে।

এ দিকে এভাবে ঘোষণা ছাড়াই পরিবহন ধর্মঘটকে অনেকে নৈরাজ্য বলে উল্লেখ করেছেন। তারা বলেছেন, অতীতেও পরিবহন শ্রমিকরা মানুষকে জিম্মি করে তাদের স্বার্থ হাসিল করেছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগ ধর্মঘট আহ্বানকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছে।

রাজধানীর সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন : গতকালও রাজধানীর সাথে সড়কপথে যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। দূর পাল্লার বেশির ভাগ বাস গতকালও রাজধানী থেকে ছেড়ে যায়নি। রাজধানীতেও স্বল্পসংখ্যক বাস প্রবেশ করেছে বলে টার্মিনাল সূত্র জানায়। সায়েদাবাদ টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, দূর পাল্লার বাসগুলো টার্মিনালে পার্কিং করে রাখা আছে। একাধিক শ্রমিক বলেছেন, তারা যাত্রী নিয়ে বের হননি। তাদের মামলা, শাস্তি ও জরিমানার ভয় রয়েছে।

একই অবস্থা দেখা গেছে গাবতলী বাস টার্মিনালেও। টার্মিনালের ভেতরেই গাড়িগুলো পার্কিং করা। মাঝে মধ্যে দু-একটি গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। শত শত যাত্রী টার্মিনালে গিয়ে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তাদের কাক্সিক্ষত বাস ছাড়ছে না। শিহাব নামের ফরিদপুরগামী এক যাত্রী গতকাল সকালে গাবতলী টার্মিনালে জানান, রাতে শুনেছেন পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু টার্মিনালে এসে দেখেন বাস ছাড়ছে না। টার্মিনাল থেকে জানানো হয়, প্রত্যাহারের ঘোষণা বাসের জন্য নয়, ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের জন্য। ঢাকার বাইরে থেকে কিছু বাস ঢাকায় আসার চেষ্টা করলেও সেগুলোকে রাস্তায় আটকে দেয়া হয়েছে। মহাখালী টার্মিনালেও শত শত বাস পার্কিং করা। মাঝে মধ্যে দু-একটি বাস ছেড়ে যাচ্ছে।

ধর্মঘট প্রত্যাহার নিয়ে বিভ্রান্তি : রাতে পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের খবর শুনে গতকাল সকালে অনেকেই বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখেন বাস ছাড়ছে না। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যপরিষদ নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট আহ্বান করে। গত বুধবার রাতে এ সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। গভীর রাত পর্যন্ত তাদের বৈঠক চলে। বৈঠকে সরকারের সাথে ওই সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সমঝোতা হয়। যে সমঝোতার ভিত্তিতে সংগঠনটি তাদের ধর্মঘট প্রত্যাহার করে। কিন্তু অনেকেই ধরে নিয়েছেন বাসও চলবে। বাস মালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনের সাথে জড়িত একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে বাস-মিনিবাস ধর্মঘট আহ্বান করা হয়নি। কাজেই ধর্মঘট প্রত্যাহারেরও প্রশ্ন আসে না। বাস-মিনিবাস মালিক শ্রমিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই গাড়ি চালাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেছেন, তারা কোনো ধর্মঘট ডাকেননি। তবে শ্রমিকরা ইচ্ছা করেই গাড়ি চালাচ্ছেন না। অন্য দিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ইনসুর আলী ধর্মঘট আহ্বানকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে গতকাল ১২ দফা দাবি পেশ করা হয়।

খুলনা ব্যুরো জানায়, খুলনায় গতকাল চতুর্থ দিনের মতো বাস চলাচল বন্ধ রাখেন চালক ও পরিবহন শ্রমিকরা। গতকাল নগরীর সোনাডাঙ্গা কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল, রয়্যাল ও শিববাড়ির মোড় থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। অধিকাংশ বাস কাউন্টার বন্ধ ছিল। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ রুটেও বাস চলাচল করেনি। নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে গত সোমবার থেকে পরিবহন ধর্মঘট শুরু করেছেন বাসচালক ও শ্রমিকরা। টানা চার দিনের ধর্মঘটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। বাস চলাচল বন্ধ থাকায় চাপ বেড়েছে ট্রেনে। সব স্টেশনেই ঈদের সময়ের মতো ভিড় দেখা যাচ্ছে।

আজ শুক্রবার যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা আছে। বাস চলাচল না করায় আগেভাগে অনেকেই ট্রেনে যশোর চলে গেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে খুলনা রেলস্টেশনে বিপুল ভর্তি ইচ্ছুককে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট নিতে দেখা যায়। অনেকে টিকিট নিতে না পেরে ট্রেনে উঠে পড়েন। তাদের বক্তব্যÑ টিটি এলে তার কাছ থেকেই টিকিট নেবেন তারা। ঢাকা থেকে আসা মালিহা রহমান তাসনিয়া বলেন, গতকাল আমার ভর্তি পরীক্ষা ছিল। খুলনা রেলস্টেশন থেকে অনেক কষ্টে টিকিট কাটলেও সিট পাইনি।

খুলনা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো: জাকির হোসেন বিপ্লব ও সহকারী সম্পাদক জিয়াউর রহমান মিঠু বলেন, খুলনায় এখনো বাস চলাচল শুরু হয়নি। বুধবার রাতে মালিক ও শ্রমিকনেতারা ঢাকায় গেছেন। মন্ত্রণালয়ে ট্রাক মালিক-শ্রমিকদের সাথে সভা হয়েছে। সেখান থেকে কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের জানানো হয়নি। তবে গতকাল সন্ধ্যার পর খুলনা থেকে বাস চলাচল শুরু হতে পারে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শ্রমিকনেতা জানান।

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা জানান, কুষ্টিয়ায় গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া বাস ধর্মঘট গতকাল ষষ্ঠ দিনেও অব্যাহত ছিল। জেলা প্রশাসনের সাথে বৈঠক করে বুধবার সকাল থেকে সব রুটে যানবাহন চলাচলের সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতাদের বৈঠকে যানবাহন চলাচলের সিদ্ধান্ত হলেও তা কার্যকর না হওয়ায় হাজার হাজার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। জেলায় যান চলাচল বন্ধ থাকায় ঢাকাসহ সারা দেশের সাথে সড়কপথে যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। তবে কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে বিআরটিসির আন্তঃজেলা বাস চলাচল করতে দেখা গেছে।

বুধবার দুপুরে বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের অফিসে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকনেতাদের সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়া বাস-মিনিবাস মালিক সমিতর সভাপতি ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী। সভায় অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চালানোর সিদ্ধান্ত হয়। তবে আন্তঃজেলা ও ঢাকার সাথে বাস চলাচলের বিষয়ে বাসের মালিকরা সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানানো হয়; কিন্তু এ সিদ্ধান্তের পরেও কোনো রুটে বাস চলাচলের খবর পাওয়া যায়নি।

কুষ্টিয়ায় বুধবার বিআরটিসির চারটি বাস উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন। কুষ্টিয়া-খুলনা রুটে এই বাসগুলো প্রতিদিন যাতায়াত করবে বলে জানা যায়। গত মঙ্গলবার দুপুরে জেলা প্রশাসক আসলাম হোসেন তার সম্মেলন কক্ষে বাস মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতাদের সাথে মতবিনিময় করেন। সভা শেষে মালিক ও শ্রমিকনেতারা বুধবার সকাল থেকে বাস চালানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন; কিন্তু কোনো বাস চলেনি। বরং ট্রাক, মাইক্রোবাস ও রেন্ট-এ কারসহ সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, আশ্বাস দেয়ার পরও কেন তারা এমন কাজ করলেন তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিষটি মন্ত্রণালয়ে জানানো হয়েছে। গতকাল সকালে মজমপুর গেটে কুষ্টিয়া মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের অফিসে গেলে সাধারণ সম্পাদক আফজাল হোসেন জানান, শ্রমিকরা কাজে যোগ না দেয়ায় জেলায় কোনো যানবাহন চলাচল করছে না। শ্রমিকরা চাইলেই সব রুটে গাড়ি চলাচল করবে। কুষ্টিয়া বাস-মিনিবাস মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক এস এম রেজাউল ইসলাম বাবলু জানান, বাস মালিক এবং শ্রমিকদের যৌথ সভা শেষে অভ্যন্তরীণ রুটে বাস চলাচলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা জানান, নতুন সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে ডাকা অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়ার পরেও সাতক্ষীরায় চলছে অঘোষিত বাস ধর্মঘট। গতকাল জেলায় চতুর্থ দিনের মতো ধর্মঘট পালন করেন শ্রমিকরা।
বাস চলাচল বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন দূর-দূরান্তের যাত্রীরা। ইজিবাইক, মাহেন্দ্র, ইঞ্জিন ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহনে তারা যাতায়াত করছেন। তবে যাত্রীবাহী বাস বন্ধ থাকলেও বিআরটিসির বাস ও সীমিতসংখ্যক ট্রাক চলাচল করতে দেখা গেছে। বাসটার্মিনাল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহিদুর রহমান জানান, চালকরা জেল-জরিমানার ভয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন না। তবে সব কিছু নির্ভর করছে শ্রমিক ফেডারেশনের সিদ্ধান্তের ওপর।

অপর দিকে, ধর্মঘটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ভোমরা স্থলবন্দরে। ধর্মঘটে বিপাকে পড়েছেন বন্দরের ব্যবসায়ীরা। ট্রাক ঠিকমতো না পাওয়ায় তাদের দ্বিগুণ খরচে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছে। বন্দর থেকে সীমিতসংখ্যক ট্রাক পণ্য নিয়ে বন্দর ছাড়ছে বলে জানা গেছে। এর ফলে নষ্ট হচ্ছে পচনশীল দ্রব্য।

উল্লেখ্য, বুধবার রাতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান পণ্য পরিবহন মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের বৈঠকের পর দাবি মেনে নেয়ার আশ্বাসের ভিত্তিতে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়া হয়।

শুরু হয়েছে নৈরাজ্য : সড়কে যান চলাচল নিয়ে যা শুরু হয়েছে তাকে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বলে মন্তব্য করেছেন অনেকে। রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, সড়ক পরিবহনের যে আইনটি করা হয়েছে সেখানে গোঁজামিল রয়েছে। এই আইন যুগোপযোগী নয়। তিনি বলেন, জরিমানা ও শাস্তি দিয়ে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো যায় না। এর সাথে অনেক কিছু জড়িত। রাস্তাঘাট নির্মাণসহ অনেক কাজই রয়েছে। হঠাৎ আইন করে তা চাপিয়ে দিলেতো অরাজক পরিস্থিতি হবেই। আবার শ্রমিকরা যে আইন মানছে না, তাও অন্যায়। তিনি বলেন, সড়ক পরিবহনে চাঁদাবাজি একটা বড় সমস্যা। অথচ চাঁদাবাজি বন্ধে কোনো উদ্যোগ নেই।

বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে নয়া দিগন্তকে বলেন, সড়ক পরিবহন সেক্টরে কিছু মালিক ও শ্রমিকদের কাছে সরকার বারবার নতি স্বীকার করায় তাদের ঔদ্ধত্য বেড়ে যাচ্ছে। মালিক শ্রমিকরা মানুষকে জিম্মি করে অন্যায় আবদার হাসিল করছে। তিনি আইন প্রয়োগে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ব্যাপারে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

 


আরো সংবাদ

সকল




Paykwik Paykasa
Paykwik