১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীতে ঠাসা

হাসপাতাল ডেঙ্গু রোগীতে ঠাসা - ছবি : সংগৃহীত

হাসপাতালগুলো ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীতে পরিপূর্ণ। মেডিসিন অনুষদের চিকিৎসকদের চেম্বারে লম্বা লাইন। ডেঙ্গু সন্দেহে আসছেন জ্বর হলেই। সবাই ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত নন। সন্দেহবশত আসছেন তারা। কারণ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে শরীরের অবস্থা খারাপ হয়ে যাওয়ার আগেই চিকিৎসার আওতায় আসতে চান। এমন রোগীতে ভর্তি এখন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল। গতকাল শুক্রবার রাজধানী ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে এক হাজার ৬৮৭ জন। এদের সবাইকে নিশ্চিত হয়েই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত ১ আগস্ট ছিল সর্বোচ্চ এক হাজার ৭১২ জন। আগস্টের দুই দিনে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে তিন হাজার ৩৯৯ জন। জুলাই মাসের ৩১ দিনে সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিল ১৭ হাজার ১৮৩ জন। 

এবার বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। এর আগে এক মাসে তো নয়ই, সারা বছরও এত বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হননি। মূলত ঢাকা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে মশা নিয়ন্ত্রণে অবহেলার কারণেই সবার ধারণা এডিস মশা বেড়েছে ব্যাপক হারে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক ডা: সানিয়া তাহমিনা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দেশের বৃষ্টির অবস্থা থেকে গত মার্চ মাসেই সিটি করপোরেশনকে সাবধান করে দেয়া হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল মার্চ মাসের মধ্যেই যেন ব্যাপক ভিত্তিতে মশা নিধনের ওষুধ ছিটানো হয়। অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা বলেন, বর্ষার শুরুতেই মশা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এতটা সমস্যা হতো না। 

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিনের চিকিৎসক জাহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ঢাকা মেডিক্যালে যারা আসছে ডেঙ্গু সন্দেহে তাদের ক্ষুদ্র একটি অংশ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। বেশির ভাগই আসছে আতঙ্কে। তিনি জানান, এই আতঙ্কটা এক দিক থেকে খারাপ না। আগেভাগেই মানুষ চলে আসছেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু তারা এভাবে সরকারি হাসপাতালে ভিড় না করে একটু পরীক্ষা করে ডেঙ্গু নিশ্চিত হয়ে এলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের সুবিধা হতো। তাহলে সরকারি হাসপাতালের চাপ কমে যেত। তিনি বলেন, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সামর্থ্যরে বাইরে কয়েক গুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আতঙ্কিত হয়ে নয়, নিশ্চিত হয়ে এখানে আসা উচিত। এখানে কাউকেই ফেরানো হয় না। এ দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে দুই শতাধিক সিট ডেঙ্গু রোগীদের জন্য। এখানেও একই অবস্থা। ডেঙ্গু সন্দেহে যারা আসছেন এর বেশির ভাগই সাধারণ ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত। 

গতকাল দুপুর পর্যন্ত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই ১৫৩ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে। মিটফোর্ডে ৩৫ জন, শিশু হাসপাতালে ৩৩ জন, হলিফ্যামিলি হাসপাতালে ৩১ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দীতে ১১৮ জন, বারডেমে ১৭ জন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯ জন, পুলিশ হাসপাতালে ১৯ জন, মুগদা হাসপাতালে ৬৪ জন, বিজিবি হাসপাতালে পাঁচজন, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৫৬ জন, কুর্মিটোলা হাসপাতালে ৯২ জন অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালে ৩৭০ জন। অবশিষ্ট ৬৬১ জন রাজধানী ঢাকার বাইরের আট বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। উপরে উল্লিখিত সবাই ডেঙ্গু সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত। এর বাইরে তিনজন রয়েছে ডেঙ্গু হেমোরেজিকে আক্রান্ত। বেসরকারি হাসপাতালের ৩৮৭ জনের মধ্যে বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২১, ইবনে সিনা হাসপাতালে ১৯, স্কয়ার হাসপাতালে ১১, শমরিতায় ২১, ল্যাবএইডে ৪, সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২৮, গ্রিন লাইফে ২৬, ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালে ২২ জন ভর্তি হয়েছে। 

বগুড়ায় নতুন আক্রান্ত ২৫ জন 
বগুড়া অফিস জানায়, বগুড়ায় প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। এতে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মোহাম্মাদ আলী হাসপাতাল, টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে ২৫ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। বগুড়ার সিভিল সার্জন ডাক্তার গওসুল আজীম চৌধুরী জানান, বর্তমানে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৫৭ জন, বগুড়া মোহাম্মদ আলী হাসপাতালে ৫ জন, টিএমএসএস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৮ জন, আদমদীঘি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন, সামছুন্নাহার ক্লিনিকে ২ জন, ইন্ডিপেন্টডেন্ট হাসপাতালে ১ জনসহ মোট ৭৪ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 

টঙ্গীবাড়ীতে এক রোগীর মৃত্যু
মুন্সীগঞ্জ সংবাদদাতা জানান, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলায় ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল ভোর ৫টায় ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামের ইদ্রিস মোল্লার ছেলে মো: আনোয়ার হোসেন (৪৫) ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে বৃহস্পতিবার তাকে ঢাকা মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 
চৌগাছায় ১৩ রোগী শনাক্ত 
চৌগাছা (যশোর) সংবাদদাতা জানান, যশোরের চৌগাছার ১৩ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে গত দুই দিনে ছয়জন নতুন করে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। তারা হলেন হায়াতপুর গ্রামের কৃষ্ণ (৩৯), রাব্বানীর ছেলে সামছুর রহমান (৩৫), টেঙ্গুরপুর গ্রামের পারুল বেগম (৩৬), পৌর শহরের নিরিবিলি পাড়ার চয়ন কুমার (২২), উপজেলা পাড়ার হাসানুর রহমান (৩৫), তরিকুল ইসলাম (২৭) ও হাজরাখানা গ্রামের স্বপন কুমার (৩০)। এর আগে ২৮ জুলাই থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত চৌগাছা মডেল হাসপাতাল থেকে আরো পাঁচজনকে ডেঙ্গু রোগী সন্দেহে যশোরে রেফার করা হয়। 

পলাশে ২ শিশুসহ ১৪ জন শনাক্ত
পলাশ (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, নরসিংদীর পলাশেও ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। এখন পর্যন্ত পলাশ উপজেলায় ১৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। বাকিদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ১৪ জনের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের ঢাকাতে পাঠানো হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের মধ্যে দুইজন শিশুও রয়েছে।
সিলেটে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা
সিলেট ব্যুরো জানায়, সিলেটে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। গত দুই দিনেই সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে ৮৪ জন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছে ১৬৫ জন। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে এ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে ৭২ জন। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য এই হাসপাতালে খোলা হয়েছে আলাদা কর্নার। এখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশির ভাগই ঢাকায় অবস্থানকালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। তবে এখন অনেকে সিলেটে থেকেও ডেঙ্গু আক্রান্ত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
ভোলার ৫ উপজেলায় ২২ রোগী শনাক্ত
ভোলা সংবাদদাতা জানান, ভোলায় গত দুই সপ্তাহে ২২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলায় এ রোগী শনাক্ত হয়; যাদের মধ্যে ১৭ জন চিকিৎসা নিয়ে চলে গেলেও এখনো চিকিৎসাধীন রয়েছে পাঁচজন। 

দোহারে ২৪ রোগী শনাক্ত
দোহার (ঢাকা) সংবাদদাতা জানান, ঢাকার দোহার উপজেলায় ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন রোগী ভর্র্তি হচ্ছে দোহার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বেসরকারি হাসপাতালেও রোগী ভর্তির খবর পাওয়া যাচ্ছে। দোহার উপজেলা হাসপাতালে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের পরিবারপরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: জসিম উদ্দিন। 

নোয়াখালীতে এক রোগীর মৃত্যু
নোয়াখালী সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালীতে গতকাল সকালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কুমিল্লা রেলওয়ের কর্মচারী মোশারেফ হোসেনের (৩০) মৃত্যু হয়েছে। নোয়াখালীর জেলা সদরের প্রাইম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তিনি সদর উপজেলার দাদপুর ইউনিয়নের হুগলি গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে।


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik