২২ আগস্ট ২০১৯

আজমীরে সিন্নি দিতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া খোরশেদ দেশে ফিরলেন

আসামে নিযুক্ত সহকারী হাইকমিশনার শাহ মুহাম্মদ তানভীর মনসুরের (ডানে) আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশে ফেরার সুযোগ পান খোরশেদ - ছবি : নয়া দিগন্ত

ভারতের আজমীর শরীফে মানতের সিন্নি দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় পথ হারিয়ে ফেলা শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী খোরশেদ আলী আসামের গুয়াহাটি থেকে দেশে ফিরেছেন। তার বাড়ি হবিগঞ্জ জেলায়। আসামে বাংলাদেশের সহকারী হাই কমিশনার শাহ মুহাম্মদ তানভীর মনসুরের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দেশে ফেরার সুযোগ পান তিনি।

রোববার স্পাইসজেট বিমানযোগে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ আসামের গুয়াহাটি থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছেন। বিমাবন্দরে তাকে গ্রহণ করেন তার বড় ভাই আজগর আলী। প্রায় এক মাস পর ভাইকে পেয়ে আবেগআপ্লুত হয়ে পড়েন খোরশেদ। আসাম সফরকারী ঢাকার একটি সাংবাদিক প্রতিনিধ দলের সাথে দেশে ফেরেন খোরশেদ। সাংবাদিকরাই তাকে তার ভাইয়ের হাতে তুলে দেন।

খোরশেদ আলীর বাড়ি হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার সুনামপুর গ্রামে। বাবার নাম সুন্দর আলী। বয়স ৪২ বছরের মতো হলেও দীর্ঘ শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার দরুণ বয়স মনে হবে ষাটের কাছাকাছি। জন্মের পর থেকেই অসুস্থ খোরশেদ আলী। শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী, পাশাপাশি ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। সুস্থতার জন্য তিনি মানত করেছিলেন ভারতের আজমীর শরীফে গিয়ে ভিক্ষা করে সেই টাকায় সিন্নি দেবেন। মানত পূর্ণ করতে দুই কন্যা সন্তানের জনক খোরশেদ আলী চলে যান আজমীর শরীফে। রীতিমতো ভিক্ষা করে সেই টাকায় সিন্নিও দেন আজমীরে।

২০-২২ দিন সেখানে অবস্থান শেষে ট্রেনযোগে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি; কিন্তু ট্রেনের ভেতর দুষ্কৃতিকারীদের খপ্পড়ে পড়েন পেশায় কৃষক খোরশেদ আলী। অজ্ঞান পার্টি তাকে নেশা জাতীয় কিছু খাইয়ে ভিক্ষা করে জমানো বেশ কিছু টাকা হাতিয়ে নিলেও খুব যত্মসহকারে আন্ডাওয়ারে রাখা পাসপোর্টসহ আরো কিছু রুপি থেকে যায় তার কাছে। এক পর্যায়ে চলে যান ভারতের ত্রিপুরায়। সেখান থেকে স্টেশন মাস্টার তাকে সিলেট সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকা করিমগঞ্জের ট্রেনে তুলে দেন। সেখানে নামার পর সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন খোরশেদ আলী। এ ব্যাপারে সেখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ী কাওসার আলম (ভারতীয় নাগরিক) তাকে নানাভাবে সহযোগীতা করেন। বিশেষ করে স্থানীয় পুলিশ ও বিএসএফসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ করে অসুস্থ খোরশেদকে বাংলাদেশে পাঠানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেন।

এ ব্যাপারে কাওসার আলম বলেন, শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ খোরশেদকে বাংলাদেশে পাঠাতে সব ধরনের চেষ্টাই করেছি। কিন্তু দুইদিন চেষ্টার পরও তা সম্ভব হয়নি। কারণ খোরশেদের ভিসায় রুট হিসেবে একমাত্র চ্যাংরাবান্ধা (ভারতের শিলিগুড়ি এবং বাংলাদেশের লালমনিরহাটের বুড়িমাড়ি সীমান্ত) উল্লেখ আছে। এই দুই দিন স্থানীয় মসজিদের মুসাফিরখানায় তাকে থাকার ব্যবস্থা করেন করিমগঞ্জের ওই ব্যবসায়ী। এরপর উপায়ন্তর না দেখে যোগাযোগ করেন আসামে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে। এরই মধ্যে অসুস্থ খোরশেদকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসাও করান তিনি।

কাওসার আলম জানান, বাংলাদেশের ভিসা করার জন্য গুয়াহাটিতে বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে গিয়েছিলাম। সেখানে ফেরদৌস নামের একজনের মোবাইল নম্বর নিয়ে এসেছিলাম। সেই নম্বরে যোগাযোগ করে অসুস্থ খোরশেদকে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে (আসাম) পাঠানোর ব্যবস্থা করি।

গত ১৭ জুলাই গাড়ি পাঠিয়ে করিমগঞ্জ থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ খোরশেদকে গুয়াহাটিস্থ বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনে নিয়ে যান সেখানকার সহকারী হাই কমিশনার শাহ মুহাম্মদ তানভীর মনসুর। রাখেন নিজের বাসায়। চিকিৎসাও করান গুয়াহাটির হাসপাতালে।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর জেল ও ডিটেনশন সেন্টারে প্রায় শতাধিক বাংলাদেশী বন্দী ছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই দেশে ফিরেছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে আরো ২৫ জনের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। বাকীদেরও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে। মূলত খোরশেদ আলমের মতো অধিকাংশই পথ ভুলে কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে আটক বা বন্দী হয়ে পড়েন ভারতে। ভাগ্য সহায় খোরশেদ আলমের। মলম পার্টির খপ্পড়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত ভাল কিছু মানুষের সহযোগিতা পেয়েছেন। তাছাড়া পাসপোর্ট হারিয়ে ফেলেননি। পাসপোর্ট হারালে বিপদ আরো বাড়তো। ফলে ভালভাবেই দেশে ফিরতে পেরেছেন।

খোরশেদকে বাড়ি পাঠানো নিয়ে এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় আসামে নিযুক্ত সহকারী হাই কমিশনার শাহ মুহাম্মদ তানভীর মনসুরের সাথে। প্রথমে তিনি স্থির করেন চ্যাংরাবান্ধা সীমান্ত দিয়ে (লালমনিরহাটের বুড়িমারি) খোরশেদকে বাংলাদেশে পাঠাবেন। এ ব্যাপারে খোরশেদের ভাই, আজগর আলীর সাথে যোগাযোগও করেন তিনি। ১৯ জুলাই হাইকমিশনের গাড়ি দিয়ে বুড়িমারি সীমান্ত পার করে দেয়ার কথা ছিল; কিন্তু পরে আবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন। কারণ, খোরশেদকে সীমান্ত পার করলেও যদি তার পরিবারের লোকজন ঠিকমতো সেখানে না পৌঁছে-এমন অনিশ্চয়তা আছেই।

অসুস্থ খোরশেদ একা সীমান্ত পার হয়ে যেতে পারবে না।। সবকিছু চিন্তা করে সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সাথে বিমানযোগে দেশে পাঠিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই অনুযায়ী ২১ জুলাই স্পাইসজেট বিমানে করে গুয়াহাটি থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন সহকারী হাই কমিশনার। এদিন নিজের গাড়িতে করে গুয়াহাটি বিমানবন্দরে খোরশেদকে নিয়ে আসেন তিনি। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও গাড়ি চালকদের দিয়ে হুইল চেয়ারে তুলে খোরশেদের বোর্ডিং পাস ও ইমিগ্রেশন পর্যন্ত সার্বক্ষণিক থাকেন এই কূটনীতিক। সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সদস্যদের অনুরোধ করেন তাকে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার বড় ভাইয়ের হাতে খোরশেদকে তুলে দেয়ার জন্য।

স্পাইসজেট বিমানে পাশাপাশি খোরশেদ আলীর সাথে পাশাপাশি আসনে বসে ঢাকায় আসেন এই প্রতিবেদক। কেমন লাগছে, জানতে চাইলে আকাশ পথেই তার হাসি খুশি উত্তর- ‘ভাল লাগছে। বাড়ি যাচ্ছি।’
ঢাকার শাহজালাল বিমানবন্দরে নেমেই তার ভাই এসেছেন কিনা জিজ্ঞাসা করেন তিনি। এসেছে জানালে দ্রুত তার কাছে যাওয়ার তাড়া দেন তিনি। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর বাইরে খোরশেদ আলীর বড় ভাই আজগর আলীর হাতে তুলে দেয়া হয়।

এ সময়, আজগর আলী জানান, প্রায় জন্ম থেকেই অসুস্থ খোরশেদের অনেক চিকিৎসা করিয়েছেন। মাঝখানে আরেকবার আজমীর শরীফে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর কিছুটা সুস্থ হয়েছিলেন। এরপর আবারো মানত করে যে, সেখানে গিয়ে ভিক্ষা করে সেই টাকায় সিন্নি দেবন খোরশেদ।

যেহেতু আগে একবার গিয়েছিল এবং কোনো সমস্যা হয় নাই তাই এবার তাকে একাই ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মলম পার্টির খপ্পরে পরে সব গোলমাল হয়ে যায়।


আরো সংবাদ

৭৫-এর পরিকল্পনাকারীদের বিচারে জাতীয় কমিশন গঠনের দাবি রাজধানীতে জেএমবির চার সদস্য গ্রেফতার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে : প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে ফিরে না গেলে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানো হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদ সচিবালয়ের আবাসন সমস্যা দূর করতে আরো ৫০০ ফ্যাট কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদে ভেলায় সবজি চাষ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে বিনিয়োগ করার আহ্বান অবশেষে রোহিঙ্গারা ফিরছেন আজ থেকে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি আরো অবনতির আশঙ্কা ১৫ আগস্ট আর ২১ আগস্টের হত্যাকাণ্ড একই সূত্রে গাঁথা : কাদের কাশ্মির নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে যাবে পাকিস্তান

সকল




mp3 indir bedava internet