২২ আগস্ট ২০১৯

‘মানুষ কতটা নির্মম হলে এভাবে একটা মানুষকে মারতে পারে?’

শনিবার সকালে নিজের চার বছর বয়সী সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করানোর খবর জানতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান তাসলিমা বেগম রেনু। তার ভাগ্নে সৈয়দ নাসির উদ্দিন টিটু থানায় গিয়ে ছবি দেখে তার লাশ সনাক্ত করেন।

ওই দিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে টিটু বলেন, "বাড্ডা থানার ইনফরমেশন সেন্টারে গিয়ে জানতে পারলাম যে, বাড্ডাতে এ ধরণের একটা ঘটনা ঘটেছে। তবে যাকে মারা হয়েছে বা আঘাত করা হয়েছে তার কোন নাম ঠিকানা নাই। আমি ভেবেছিলাম হয়তো গুজব। কিন্তু পরে আরেক কর্মকর্তার কাছে ছবি দেখে নিশ্চিত হই।"

তিনি বলেন, "এ ঘটনার এমন সাজা হওয়া দরকার যা সব মানুষকে একটা বার্তা দেবে যে, আইনের কাজগুলো যাতে মানুষ নিজের হাতে তুলে না নেয়। তাদের শাস্তিটা হবে সব ধরণের কুসংস্কার ও অন্ধকারের বিরুদ্ধে। এমন একটা শাস্তি হবে যা বার্তা দেবে পশুত্বের বিরুদ্ধে। একটা মানুষ কতটা পশুর মতো নির্মম হলে এভাবে একটা মানুষকে মারতে পারে।"

বাড্ডা থানার এসআই সোহরাব হোসাইন বলেন, "এ ঘটনায় অজ্ঞাতদের নামে মামলা করা হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের সনাক্ত করার চেষ্টা করছি আমরা। এখনো সনাক্ত করা যায়নি। সনাক্ত করা গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।"

শুধু তাসলিমা বেগম রেনু নন, শনিবার ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরো দুই জন।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি আরিফুর রহমান বলেন, "শনিবার রাত সাড়ে দশটার দিকে কমলগঞ্জের রহিমপুর ইউনিয়নের দেউরাছড়ায় এক যুবককে আটক করে উত্তেজিত জনগণ মারধর করে। পরে সদর হাসপাতালে নেয়ার পর তার মৃত্যু হয়।"

একই সন্দেহে আরেকটি হত্যার ঘটনার খবর মেলে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে। সেখানেও এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়াও গাজীপুরে এক মানসিক ভারসাম্যহীন নারীসহ বিভিন্ন জেলায় বেশ কয়েক জনকে পিটিয়ে আহত করার খবর পাওয়া গেছে।

নওগাঁয় ছেলে ধরা সন্দেহে ছয় জনকে উত্তেজিত জনতা গণপিটুনি দেয়ার পর তাদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগছে- এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর এ ধরণের গণপিটুনির ঘটনা শুরু হয়।

গত ১৮ই জুলাই, নেত্রকোনায় এক যুবকের ব্যাগ থেকে এক শিশুর কাটা মাথা উদ্ধারের ঘটনা এসব গুজবে ঘি ঢালে। তবে নেত্রকোনা মডেল থানার ওসি জানিয়েছেন, ওই গুজবের সাথে এ ঘটনার কোন সম্পর্ক নেই।

বাংলাদেশ পুলিশের মুখপাত্র সোহেল রানা বলেন, এসব ঘটনা বাংলাদেশ পুলিশ যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখছে। এ ধরণের প্রতিটি ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি।"

"আমরা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং আমাদের অন্যান্য গোয়েন্দা তৎপরতার মাধ্যমে এই ছেলেধরার নামে পিটিয়ে হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট যারা তাদের খুঁজে আইনের আওতায় আনবো। গুজব ছড়িয়ে যারা বিভ্রান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, একটি স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে যারা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে তাদেরকে আমরা সতর্ক বার্তা জানাতে চাচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধেও আমাদের টিমগুলো সক্রিয় রয়েছে," তিনি বলেন।

এ ধরণের ঘটনা প্রতিরোধে কি ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ''গণপিটুনির ঘটনা যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করতে আইনি তৎপরতা ছাড়াও জনসচেতনতা মূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছেন তারা।''

তিনি বলেন, "আমরা গণসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছি। আমরা জনগণকে আহ্বান জানিয়েছি, যেন কোন ভাবেই তারা নিজের হাতে আইন তুলে না নেন। মিথ্যা বা বিভ্রান্তিমূলক কোন খবরে কান না দেন। কারো উপর যদি কোন সন্দেহ হয় তাহলে, পুলিশের সহায়তা নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।"

তিনি বলেন, "এগুলো রুখতে একাধিক সাইবার টিম কাজ করছে। এরমধ্যে আমরা অনেককে গ্রেফতার করেছি। এর নেপথ্যে যারা আছে তাদেরকে অল্প সময়ের মধ্যেই আইনের আওতায় আনবো।"

মিডিয়া ব্রিফ এবং পুলিশের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ওয়েবসাইটের মাধ্যমে প্রতিটি টিমের প্রতিটি ইউনিট পর্যায়ে নিজস্ব পেজের ও চ্যানেলের মাধ্যমে সতর্কতামূলক কর্মসূচী প্রচারের কথাও জানান তিনি।

গণপিটুনির কোন পরিকল্পনা থাকে না বলে এগুলো ঠেকানো কঠিন বলে মনে করেন সমাজ বিজ্ঞানী ড. ফাতেমা রেজিনা।

তিনি বলেন, "ঘটনাগুলো যখন ঘটছে তখন, আসলে কি কারণে গণপিটুনি, কোন ছেলেধরা আছে কিনা, বা কোন পিকপকেটার আছে কিনা বা কোন ক্রিমিনাল আছে কিনা এগুলো বোঝার আগেই মানুষ আবেগের বশবর্তী হয়ে একাজগুলো করে। এখন মানুষের আবেগকে আপনি কিভাবে চেক দেবেন?"

তবে তিনি বলেন যে, গণপিটুনি ঠেকানোর একমাত্র পথ হচ্ছে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা।

টিকা দেয়া, বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের মতো বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রচারণার মাধ্যমে গণপিটুনি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে সতর্কতার জন্য প্রতিদিনই প্রতিবেদন আসে। এধরণের পদক্ষেপ নিতে হবে, মানুষকে সচেতন করতে।

তিনি বলেন, "সচেতনতা সৃষ্টিতে গণমাধ্যম বিশেষ করে টেলিভিশনের বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। কিছু ছোট ছোট বিজ্ঞাপন তৈরি করা যেতে পারে যেখানে দেখানো যেতে পারে যে এসব ঘটনায় কিভাবে মানুষ আক্রান্ত হয় তাহলে মানুষ সচেতন হবে। এছাড়া পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা, লিফলেট প্রচার করা যেতে পারে, মাইকিং করা যেতে পারে। এগুলো মানুষকে বার্তা দেয়।

শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে এ ধরণের ঘটনা ঠেকানো সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

"কোন একটা গুজব সৃষ্টি হয়েছে তারপর সেখানে পুলিশ যাবে, সেটা নিয়ন্ত্রণ করবে এটা বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার," তিনি বলেন। সূত্র : বিবিসি।


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet