২৭ মে ২০১৯

নুসরাতকে হারিয়ে ছোট ভাই রায়হান যেন জীবন্ত লাশ

নুসরাতকে হারিয়ে ছোট ভাই রায়হান যেন জীবন্ত লাশ - ছবি : সংগ্রহ

ঘরের এক কোণে পড়ে আছে একটি টেবিল। টেবিলের ওপরে কয়েকসারিতে রয়েছে স্তুপ করা অনেকগুলো বই-খাতা। জানতে পারলাম, এই টেবিলেই পড়া-শুনা করত নুসরাত ও রায়হান। সপ্তাহখানেকের মধ্যে পড়ার টেবিলের কাছে কেউ না এলে যেমন ধূলাবালির আভাস অনুভব করা যায়, তেমনই মনে হলো। কিছুদিন পড়তে বসেনি কেউ এই টেবিলে।

নিকটাত্মীয়রা জানায়, এই টেবিলকে সামনে রেখে দিনের সকাল শুরু হতো নুসরাত আর রায়হানের। সকালে পড়াশুনা শেষে, দুই ভাই-বোন একসঙ্গে কথা বলতে বলতে বের হতো মাদ্রাসার উদ্দেশে। মাদ্রাসা ছুটিলগ্নে ভাই তার বোনের জন্য অপেক্ষা করতো বাড়ি ফেরার আশায়।

রাত্রি বেলায় টেবিলে বই সামনে রেখে, চা’য়ে চুমুক দিতে দিতে বন্ধুতুল্য দুই ভাই-বোন হারিয়ে যেতো গল্পে, হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুঁটিতে। আজ দিন বিশেক হলো টেবিলে কেউ আর পড়তে বসে না। খুনসুঁটিও নেই ভাই-বোনের।

খুনসুঁটির মানুষ যখন হারিয়ে যায়, কার সাথে আর খুনসুঁটি হবে? আজকে ১৫ দিন হলো সেই খুনসুঁটি করা মানুষের মুখও দেখা যায় না। পৃথিবীতে হয়তো আর কখনো দেখা হবে না এই মুখ। হবে না, কোনো দিন ভাই-বোনের সেই পড়ার টেবিলের আড্ডা। বোনের সাথে কাটানো অতীতের স্মৃতিগুলো কোনভাবেই ভুলতে পারছে না রায়হান। বোনের অসহ্য মৃত্যুযন্ত্রণা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছে না সে। চোখের পানি শুকিয়ে চৈত্র খরা বয়ে যাচ্ছে হৃদয়ে। নেই কোনো খাওয়া-দাওয়া। বোনের মৃত্যুর সময়কালীন বারা বার জ্ঞান হারিয়ে হয়ে যায় অচেতন, জ্ঞান ফিরলে আবার বোন রাফিকেই খুঁজে রায়হান।

বোন নুসরাত জাহান রাফিকে হারিয়ে ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান হয়ে গেছে এক জীবন্ত লাশ। বোনকে হারিয়ে, অসুস্থ হয়ে পড়া রায়হানকে ভর্তিও হয় ফেনীর একটি হাসপাতালে।

বাবা কে. এম. মূসা বলেন, নুসরাতের মৃত্যুতে সবচেয়ে বড় শোকাহত ছোট ভাই রায়হান। সে নুসরাত থেকে মাত্র দুই বছরের ছোট। দুই ভাই-বোন একসঙ্গে মাদরাসায় আসা-যাওয়া করত। নুসরাত ছিল আলিম পরীক্ষার্থী আর রায়হান দশম শ্রেণীর ছাত্র। ছোটবেলা থেকে দু’জন একসাথে খেলাধুলা আর চলাচল সঙ্গী হিসেবে বড় হয়েছে।

১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষায় আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত। ২৭ মার্চ বেলা ১২টার দিকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজদ্দৌলা তার অফিস কক্ষে নুসরাতকে ডাকেন। শিক্ষকের ডাকে সাড়া দিয়ে কক্ষে আসেন নুসরাত। কিন্ত অধ্যক্ষ তাকে ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া আলিম পরীক্ষার প্রশ্ন দেয়ার প্রলোভন দেখায় এবং তাকে যৌন হয়ারানি করে। প্রতিবাদী নুসরাত মুখবুজে তা সহ্য না করে, বাড়িতে গিয়ে বাবা-মাকে ঘটনা খুলে বলে। পরবর্তীতে তারা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করে এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপরই শুরু হয় আসল ঘটনা।

৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ফাযিল সিনিয়র মাদরাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। তাকে কৌশলে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে বোরকা পরিহিত ৪-৫ জন ব্যক্তি মিলে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

পরিবারের দাবি, মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে অশ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেওয়ায় এই ঘটনা ঘটেছে। এই তথ্য নুসরাত হাসাপতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও জানিয়েছিল।

অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়াতে ৬ এপ্রিল বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের ১০২ নম্বর কক্ষে তাকে ভর্তি করা হয়। পরে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে (আইসিইউ) ভর্তি করা হয়। লাইফসাপোর্ট দেয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে নুসরাত চলে যায় না ফেরার দেশে।

হয়তো আর কোনদিন হবে না ভাই-বোনের এই খুনসুঁটি। জমবে না পড়ার টেবিলের আড্ডাও। তবুও সান্ত্বনা হবে, পৃথিবীতে কোনো অপরাধী আইনের উধের্ব নয়, যদি বোনের হত্যাকারীদের বিচার পাওয়া যায়, তবে বোনের প্রতিবাদী বিজয়গাঁথা রচনা নিয়ে দেখা হবে কখনো পরপারে।


আরো সংবাদ

Instagram Web Viewer
hd film izle pvc zemin kaplama hd film izle Instagram Web Viewer instagram takipçi satın al Bursa evden eve taşımacılık gebze evden eve nakliyat Canlı Radyo Dinle Yatırımlık arsa Tesettürspor Ankara evden eve nakliyat İstanbul ilaçlama İstanbul böcek ilaçlama paykasa
agario agario - agario