১৮ জুন ২০১৯

সোনাগাজীর সেই ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে মামলা

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় সোনাগাজী মডেল থানার প্রত্যাহার হওয়া ওসি মোয়াজ্জামের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছেন ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন।

সোমবার দুপুরে ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে এ মামলা দায়ের করেন।

সায়েদুল হক সুমন বলেন, নুসরাতের জবানবন্দীর ভিডিও ধারণ ও তা প্রকাশ করে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারা লঙ্ঘন করেছেন মোয়াজ্জেম হোসেন। আদালতে এই বিষয়টি নজরে আনা হবে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে নিপীড়নের ঘটনাকে ‘নাটক’ ও পরবর্তীতে হত্যার ঘটনাকে ‘আত্মহত্যায়’ রূপ দিতে চেষ্টা চালিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ আছে।

এসব ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ তার সহযোগীদের কাছ থেকে ওসি মোয়াজ্জেম মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে তাকে প্রত্যাহার করা হয়।

এর আগে গত ২৭ মার্চ যৌন হয়রানির অভিযোগ দিতে নুসরাত সোনাগাজী থানায় গেলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ও পরিদর্শক (তদন্ত) কামাল হোসেন। আর সেই জিজ্ঞাসাবাদের সময়ের ভিডিও করেন তারা। পরে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে এরই মধ্যে বদলি করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পুলিশের আইজি বলেছেন, তার বিরুদ্ধে যদি অপরাধের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কিন্তু বিশ্লেষকরা এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিবেচনা করে বলছেন, সোনাগাজী থানার ওসি দায়িত্বে অবহেলা করেছেন, শুধু এটা বললে তাকে বাঁচিয়ে দেয়া হবে। তিনি আসলে সরাসরি অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন। অপরাধীদের সহযোগীতে পরিণত হয়েছেন। তিনি নুসরাতের যৌন নিপীড়ণকারী ও হত্যাকারীদের সমান অপরাধ করেছেন। তাই তারা বলছেন, বদলি বা প্রত্যাহার নয়, এই মামলায় তাকে আসামি করে বিচারের মুখোমুখি করাই হলো আইনের শাসনের দাবি।

কয়েকটি ঘটনা সামনে আনলেই ওসির অপরাধ সুনির্দিষ্ট করা যায়-
১. গত ২৭ মার্চ নুসরাতকে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা তার অফিস কক্ষে যৌন হয়রানি করেন। নুসরাত অভিযোগ করলে থানায় নিয়ে তাকে জেরা করেন ওসি। আর সেই জেরায় অনৈতিক প্রশ্ন করেন। যার উদ্দেশ্য ছিল নুসরাতের অভিযোগ নাটক বলে চালিয়ে দেয়া। এই জেরা তিনি ভিডিওও করেন। নুসরাত মুখ ঢেকে কথা বললেও তিনি বার বার মুখ থেকে হাত সরানোর চেষ্টা করেন। ওই ভিডিও তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে দিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন এর মাধ্যমে তিনি প্রথমত নারী শিশু নির্যাতন দমন আইনে অপরাধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, জিজিটাল সিকিউরিটি আইনেও অপরাধ করেছেন।

২. গত ৬ এপ্রিল সকালে পরীক্ষার আগে নুসরাতকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আর এটাকে ওসি সরাসরি আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন। সংবাদ মাধ্যমের কাছেও বলেন। এখানেও ওসির উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট। এটা অপরাধীদের সহযোগিতা করার অপরাধ। যিনি অপরাধ করেছেন তার সমান অপরাধহিসেবেই গণ্য হচ্ছে এটি।

এই ঘটনার সঙ্গে আরো অনেকের মতো অপরাধীদের সঙ্গে সক্রিয় ছিলেন সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদ আলম। তিনিও অধ্যক্ষকে রক্ষায় শিক্ষার্থীদের দিয়ে অধ্যক্ষের মুক্তির দাবিতে মিছিল বের করিয়েছেন। ওসির মত তিনিও নুসরাতের শরীরে আগুন দেয়ার ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করেন। স্থানীয় সাংবাদিকদের তা লেখার জন্য চাপও দিয়েছেন। ফলে শুধু অপরাধীর সহযোগী নয় ওসি রাজনৈতিক ‘সেবা' দেয়ারও চেষ্টা করেছেন।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘সোনাগাজীর ওসি যা করেছেন সেটাকে দায়িত্বে অবহেলা বললে তার অপরাধ কমিয়ে দেখা হবে। তিনি যা করেছেন, তা হলো সরাসরি অপরাধীদের সহযোগিতা করেছেন। এটা ফৌজদারী অপরাধ। তাকে যদি এই অপরাধে শাস্তির আওতায় আনা না হয় তাহলে ন্যায় বিচার হবে না।''

তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশ প্রশাসনের অনেকেই এখন রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ থেকে তাদের অনেক অন্যায় সুবিধা দিয়ে থাকেন। এর মাধ্যমে তারা নিজেরাও অনৈতিক সুবিধা নেয়। আর তারা মনে করে, প্রভাবশালী রাজনীতিকদের সঙ্গে থাকলে তারা যেকোনো অন্যায় এবং অনৈতিক কাজ করে টিকে যাবেন। এটি একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা। বাংলাদেশে এর কারণে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ না করলে কোনো কাজ হয়না।''

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘‘এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে অপরাধী এবং দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের অনুকম্পা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই।''


আরো সংবাদ