২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

২৪ ঘণ্টায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের ৪০ জনকে আটকের অভিযোগ

২৪ ঘণ্টায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের ৪০ জনকে আটকের অভিযোগ - ছবি : নয়া দিগন্ত

গত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় ৪০ জনকে আটক করেছে বলে দাবি করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে। রাজধানীর তেজগাঁও, মহাখালী এলাকায় বুধবার ভোর রাতে রেইড দিয়ে এদের আটক করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। এদের অনেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। তবে এ ধরনের আটকের কথা অস্বীকার করেছে পুলিশ।

আটক ছাত্রদের পরিবার ও অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, বুধবার ভোর রাতে তেজগাঁও মহাখালী এলাকায় রেইড দিয়ে বিভিন্ন বাসা বাড়ী ও মেসে হানা দিয়ে প্রায় ৪০ জন ছাত্রকে আটক করে পুলিশ। এর মধ্যে সকাল ৬টায় ১৯/এ রসূলবাগ, হাজী বিল্ডিং, মহাখালী থেকে আটজন, সকাল ৬.৪৫ টায় ২১৫/৩, ইউসুফ কুঠির, তেজকুনিপাড়া, তেজগাঁও থেকে ১৬ জন, ২৪৮/২, বিজিপ্রেস, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে সাতজনসহ মোট ৪০ জনকে আটক করা হয়। তাদের বেশির ভাগই ঢাকা পলিটেকনিকের ছাত্র। অনেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির জন্য কোচিং করছে। তবে আটকের কথা অস্বীকার করছে পুলিশ।

আটকের পর অস্বীকারের বিষয়ে ছাত্রদের অভিভাবকরা জানান, আটকের সময় পুলিশ ছাত্রদের তেজগাঁও থানায় নেয়া হচ্ছে বলে অভিভাবকদের জানিয়েছিল। পরে তেজগাঁও ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় যোগাযোগ করলে ছাত্রদের ডিবি অফিসে রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়। কিন্তু ডিবি অফিসে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে আটক ছাত্রদের ব্যপারে কোনো তথ্য দেয়া হচ্ছে না।

আটকের পর ২৪ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও কোর্টে না তোলায় অভিভাবকরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। ছাত্রদের মাঝেও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

আটককৃতদের মধ্যে একজনের বাবা মাহবুবুল আলম বলেছেন, তিনি তার সন্তানের জন্য মিন্টু রোডস্থ ডিবি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান করছেন। তিনি জানতে পেরেছেন তার সন্তান ওখানে আছে।

আরো পড়ুন :

সিভিল সোসাইটি ও কোটা সংস্কার আন্দোলন
ড. আবদুল লতিফ মাসুম

বর্তমান বিশ্বে ‘সিভিল সোসাইটি’ একটি বহুল আলোচিত পরিভাষা। অনেক ইংরেজি শব্দের মতো এটিও বাংলা ভাষায় গৃহীত হয়েছে। অবশ্য অনেকে ‘সুশীলসমাজ’ বলে একটি প্রতিশব্দ ব্যবহার করেন। এর আরো প্রতিশব্দ রয়েছে- নাগরিক সমাজ, বেসামরিক সমাজ ও লোকমণ্ডলী ইত্যাদি। সুশীলসমাজের সংজ্ঞা নিয়ে নানা মুনীর নানা মত। সিভিল শব্দটি ইংরেজি মিলিটারি শব্দের বিপরীত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। ধরে নেয়া হয়, বেসামরিক লোকজনের এটি একটি কার্যক্রম। প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় সিভিল ডিফেন্স শব্দটি যখন ব্যবহার করা হয়, তখন দেশরক্ষায় জনগণের সহায়ক কার্যক্রমকে বোঝানো হয়। সামরিক শাসন ও সামরিক কার্যক্রমের বাইরে সমাজের অতি সাধারণ মানুষের কর্তব্য ও কার্যক্রমকে সিভিল সোসাইটি বলা যায়। বিষয়টি আস্তেধীরে বিকশিত হয়েছে। সিভিল সোসাইটির অতীতের উৎস এবং বর্তমান তাৎপর্যের মাঝে বেশ পার্থক্য রয়েছে।

এখন সিভিল সোসাইটি মানে হচ্ছে, সরকার ও জনগণের মধ্যবর্তী ক্রিয়াশীল নাগরিক সাধারণ। তারা সরকারে অবস্থান করেন না, অথচ রাষ্ট্র ও সমাজের তরফ থেকে একটি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেন। বর্তমান সময়ে জনসাধারণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠার সাথে সিভিল সোসাইটির সম্পৃক্ততা বিশ্বব্যাপী। এটি একটি ঐচ্ছিক সমিতির মতো। স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে এটি জনসাধারণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরব থাকে। বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটি গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নির্বাচনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। সমাজের জ্ঞানীগুণী, পেশাজীবী সম্প্রদায় এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশীদারদেরও সিভিল সোসাইটির সদস্য বলে গণ্য করা হয়। দৃশ্যত দেশের কবি-সাহিত্যিক, বিদ্বজ্জন, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, এনজিওকর্মী ও ছাত্রসমাজকেও সিভিল সোসাইটির অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হয়। গণমাধ্যম, বিশেষত সরকার পরিচালিত গণমাধ্যমের বাইরে অবস্থানরত সব সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংশ্লিষ্ট সবাই সিভিল সোসাইটির সদস্য। এই সোসাইটি তার বহুবিধ কার্যক্রমের দ্বারা সরকার ও জনগণের মধ্যে হতে পারে একটি সেতুবন্ধ। সিভিল সোসাইটির চারটি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান- ১. প্লুরালিজম বা বহুত্ববাদ, ২. জনমত, ৩. স্বকীয়তা ও ৪. বৈধতা বা নিয়মতান্ত্রিকতা। সব মিলিয়ে এক কথায় গণতান্ত্রিক কার্যক্রম বলেও একে অভিহিত করা যায়।


বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে রাজনৈতিক কার্যক্রমের সাথে সাথে সিভিল সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তদানীন্তন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের পৃথক সত্তা প্রমাণে লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা তাদের নিজ নিজ ভূমিকা রেখেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সূচনা ও সফলতায় রয়েছে ছাত্রসমাজ, লেখক ও কবি-সাহিত্যিকদের অনন্য ভূমিকা। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দেশ বিভাগের আগেই নির্দেশনামূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। মওলানা আকরম খাঁ শক্তভাবে বাংলা ভাষার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে তমদ্দুন মজলিস রাষ্ট্রভাষা বাংলা প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনের সূচনা করে। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের দাবিনামা প্রণয়নে সিভিল সোসাইটি যথার্থ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখেন। ১৯৬৬ সালে ঘোষিত ঐতিহাসিক ছয় দফা প্রণয়ন এবং রাজনৈতিক শক্তিকে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা দান একটি বড় ঘটনা। এ সময় এ অঞ্চলের অর্থনীতিবিদেরা ভৌগোলিক অবস্থানের বাস্তবতায় ‘টু ইকোনমি’ বা দ্বৈত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্ররা মুখ্য ভূমিকা পালন করলেও এর পেছনে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মৌলিক ভূমিকা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর শামসুজ্জোহার রক্ত আইয়ুবের পতনকে অনিবার্য করে তোলে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সিভিল সোসাইটি তাদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকার মাধ্যমে মুক্তির যুদ্ধকে ত্বরান্বিত করে।

স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে এত গুরুত্বপূর্ণ অবদানের পরও ১৯৭২ সাল-পরবর্তীকালে বাংলাদেশে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা নি®প্রভ হয়ে যায়। বাংলাদেশী সমাজের অতিমাত্রিক রাজনীতিকরণ করার ফলে সিভিল সোসাইটি তাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামশীল বাঙালি জাতি কর্তৃত্ববাদী শাসনের কবলে নিপতিত হয়। বাকশালের মাধ্যমে ‘এক নেতা এক দেশ’ তথা একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ফলে সিভিল সোসাইটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৭৫ সালের পরবর্তীকালে জিয়াউর রহমান যখন ধাপে ধাপে ক্রমেই বেসামরিকীকরণ প্রক্রিয়ায় দেশকে গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন প্রথমবারের মতো দেশের বুদ্ধিজীবীদের তরফ থেকে একটি সমর্থকসূচক বিবৃতি প্রকাশিত হয় (মাহফুজুল্লাহ : ২০১৬ : ৪৯৪-৯৬)। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ সব পেশাজীবীর প্রবল ভূমিকা লক্ষ করা যায়। বিশেষ করে ত্রিপক্ষীয় ঘোষণা সংযোজনে গণমাধ্যম তথা জাতীয় প্রেস ক্লাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

পরবর্তীকালে রাজনৈতিক দল-ভিত্তিক সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময়কালে সিভিল সোসাইটি ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত ভূমিকার বদলে দলভিত্তিক বিভাজনে লিপ্ত হয়েছিল। প্রেস ক্লাবে দেয়াল ওঠে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাদা, নীল ও গোলাপি রঙ তীব্রতর হয়ে ওঠে এবং পেশাজীবী সম্প্রদায়গুলো দ্বিদলীয় প্রভাবে বিভক্ত হয়ে যায়। ২০০৬-০৮ সালে দেশে যখন গণতন্ত্রের সঙ্কট তীব্রতর হয়, তখন সিভিল সোসাইটির একটি অংশ সামরিক বাহিনী কথিত ‘ইউনিক ডেমোক্র্যাসি’কে স্বাগত জানায়। অবশ্য অবশেষে ছাত্রজনতার চাপের মুখে সিভিল সোসাইটির চেহারা বদলে যায়। তাদের পরিবর্তিত? গণতন্ত্রের অনুকূল ভূমিকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আশা করা গিয়েছিল, নির্বাচন-পরবর্তীকালে সিভিল সোসাইটির ভূমিকা আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। কিন্তু কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রাষ্ট্র ও সরকারে প্রবল হয়ে উঠলে সিভিল সোসাইটির বিভাজন আরো তীব্র হয়ে ওঠে। এর সাথে যুক্ত হয় ভিন্ন মত পোষণে সরকারের নিপীড়ন ও নির্যাতনের পথ গ্রহণ। রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি স্পষ্ট যে, হিটলারের নাৎসি নীতি এবং মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী কৌশল ভিন্ন মতকে গ্রহণ করেনি; বরং ছলে-বলে তারা সব ক’টা জানালা খোলার পরিবর্তে সব দুয়ার বন্ধ করে সমাজকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে। সরকার যথারীতি লোভ-লালসা ও অর্থবিত্ত দিয়ে সিভিল সোসাইটিকে সরকারের স্তাবকে পরিণত করতে চেয়েছে। সর্বত্রই তারা ‘প্রশস্তির প্রশান্তি’ পেতে চায়।

বলা হয়ে থাকে, মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে। মনে হয়, বাংলাদেশের সিভিল সোসাইটি তথা বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজে পচন শুরু হয়েছে। বুদ্ধিজীবীরা এখন পরস্পর দলাদলি ও হিংসা-প্রতিহিংসায় অবতীর্ণ। তারা গোটা জাতির বিবেকবুদ্ধি ও অধিকারের প্রতিনিধিত্ব না করে নিজ নিজ দলের এতটাই আনুগত্য করছেন যে, লোকজন এদের ‘দলকানা’ বুদ্ধিজীবী বলে অভিহিত করছে। শত নিপীড়ন ও নির্যাতনের মধ্যেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঔপনিবেশিক আমলে যে সাহস ও বুদ্ধিমত্তা তারা দেখিয়েছেন, তা আজ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। একজন প্রফেসর আবু মাহমুদ এনএসএফের গুণ্ডাদের মার খেয়েও পরাজয় বরণ করেননি। একজন উপাচার্য গভর্নর মোনায়েম খানের আদেশ উপেক্ষা করে পদত্যাগ করাকে মর্যাদাপূর্ণ মনে করেছেন। এখন উপাচার্য শাসক দলের মুখপাত্রের মতো কথা বলছেন। তিনি সব ছাত্রের প্রতিনিধিত্বের বদলে কিছু সহিংস মাস্তানের প্রতিনিধিত্ব করাকে নিরাপদ মনে করছেন। সাধারণ ছাত্রদের প্রতি লেলিয়ে দেয়া গুণ্ডাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন। তার প্রক্টর ও প্রশাসন এতই অন্ধ যে, তারা চোখে কিছুই দেখেন না।

আসলে জীবনানন্দের সে কথাই সত্য- ‘অদ্ভুত আঁধার এক পৃথিবীতে নেমেছে’। যে শিক্ষকেরা সাধারণ ছাত্রদের প্রতি নিপীড়নের প্রতিবাদ করছেন এবং ন্যায় ও সত্যের পক্ষে কথা বলছেন, তাদেরই প্রতিপক্ষ আরেক দল সহকর্মী লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে সরকারের দমনপীড়নকে বৈধ করার জন্য নানা ধরনের কৌশলী কথাবার্তা বলছেন। সরকার বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সময়ে-অসময়ে আটক করছে; মামলা দিচ্ছে। কখনো বা কেউ হঠাৎ করে গুম হয়ে যাচ্ছেন কেউ। হজম করতে না পারলে রাস্তায় ফেলে দিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একজন প্রগতিশীল বিবেকবান বুদ্ধিজীবীকে গুম করে সীমান্তের ওপারে পাচারের চেষ্টা করা হয়েছে। গুমের অভিযোগে তিনি যখন বিচার চাইলেন, উল্টো তার নামে মামলা দেয়া হলো। স্তব্ধ হলেন তিনি। দেশের সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় সচেষ্ট একজন প্রবীণ শিক্ষককে রাজপথে লাঠিপেটা করতেও বিবেকে বাধে না। কোটা আন্দোলনে নিপীড়িত ছাত্র-শিক্ষকদের সমর্থনে মানববন্ধনও করা যায় না; বরং অভিভাবক ও সাধারণ নাগরিকদের আটক করা হয়। অতি সাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, ‘টকশো’তে তাদের সমালোচনাও সহ্য হয় না। তারা তাদের নিশাচর বা গভীর রাতের অপরাধী বলতে চান। একজন প্রবীণ সাংবাদিক অবশ্য উল্টো করে বলেছিলেন, এদের দেখলেই ‘চোর চোর বলুন’। তারা কেবল প্রশস্তি এবং প্রশস্তি পেতে চান। কেবল বন্দনাই তারা শুনতে চান, বদনাম শুনতে চান না। ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও একটু-আধটু সমালোচনা সহ্য হয় না। একজন বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষককে মৃদু সমালোচনার জন্য জেল দেয়া হয়েছে। চাকরিচ্যুত করা হয়। তোষামোদ, চাটুকার তথা দলীয় মাস্তানেরা জেলায় জেলায় মামলা ও হামলা করে বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে দিতে চায়। এই সেদিন, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা করায় আটক করা হয়েছে একজন সাধারণ মানুষকে। এদের মানসিক অবস্থান এতটাই নীচু হয়ে পড়েছে যে, লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদ মিছিলও এদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। এদের চোখ এতটাই হলুদ হয়েছে, যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রাজাকারের প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়।

এর সর্বশেষ উদাহরণ কোটাবিরোধী স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন। সাধারণ ছাত্রদের একটি ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিক আন্দোলনকে তারা যেভাবে প্রথম থেকে এ পর্যন্ত মোকাবেলা করেছে, তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। যেকোনো আন্দোলনকে সরকারবিরোধী মনে করার যে রোগ পেয়ে বসেছে, সেই ধারণা থেকে এই আন্দোলনকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা চলেছে। যখন আন্দোলনের প্রাবল্য এবং অপ্রতিরোধ্যতা দেখেছে, ভোল পাল্টে তারা আন্দোলনের সাথে একাত্ম হয়েছে। সর্বোচ্চ প্রকাশ্য ঘোষণা যে একটি বড় ধরনের চালবাজি, এটা বোঝা গেল যখন একই জায়গা থেকে বিরূপ কথা শোনা গেল। মুক্তিযুদ্ধের মতো আবেগকে ব্যবহার করে শঠতার আশ্রয় নেয়া হলো। এখন তারা কোটাবিরোধী আন্দোলন কোনো কারণে বুঝে উঠতে পারছে না। তবে তিন দিনের মাথায় রাজধানী যখন সম্মিলিত জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল, তখন ঠিকই বুঝতে পেরেছিল। ন্যায়, সত্য, যৌক্তিকতা বলে কি কিছু নেই? কেবলই শক্তির মদমত্ততা! তাহলে ‘শক্তের ভক্ত, নরমের যম’Ñ এ নেতিবাচক বাক্যকেই কি নাগরিকদের বিশ্বাস করতে হবে? না, দেশের মানুষ তা বিশ্বাস করতে চায় না। এত কিছুর মধ্যেও সিভিল সমাজের একটি বড় অংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা ছাত্রদের ন্যায্য দাবির সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। শিক্ষকসমাজ মনে করে, শিক্ষকদের দায়িত্ব শুধু পাঠদানেই সীমিত নয়। অতীতে শিক্ষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতা আন্দোলনে শিক্ষকেরা যেমন আলোকবর্তিকার ভূমিকা পালন করেছেন; এখনো ন্যায়, সত্য ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পথ প্রদর্শন শিক্ষকদের দায়িত্ব।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ