২১ নভেম্বর ২০১৮

শিক্ষার্থীরা সরে যাওয়ার পর পরিবহন শূন্যতায় যাত্রীরা

শিক্ষার্থীরা সরে যাওয়ার পর পরিবহন শূন্যতায় যাত্রীরা - নয়া দিগন্ত

রাজধানীর বিভিন্ন পয়েন্টে  শিক্ষার্থীদের দিনভর আন্দোলনে মঙ্গলবার দীর্ঘ জ্যামের অভিজ্ঞতা পেয়েছে ঢাকাবাসী। বিকেলে শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছেড়ে যাওয়ার পরে জ্যাম কিছুটা কমলেও ভোগান্তি শেষ হয়নি যাত্রীদের। কারণ সঠিক কাগজপত্রের অভাবে পরিবহন শূণ্য হয়ে পরে প্রধান রাস্তাগুলো। 

মূলত ঢাকায় জাবালে নূর পরিবহনের চাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর প্রতিবাদে কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভের মধ্যে সড়ক থেকে বাস সরিয়ে নিয়েছেন পরিবহন মালিকরা। এর ফলে বিক্ষোভে সড়ক আটকে থাকায় রাজধানীবাসীর চলাচল যেমন আটকে গেছে; অন্যদিকে গণপরিবহন না পেয়েও ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

গত রোববার ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর বিমানবন্দর সড়কে গাড়ি ভাংচুরের পর রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করেছিল শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা।

পরদিন তাদের পাশাপাশি ধানমণ্ডিতে কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরাও সড়কে নেমে বিক্ষোভ দেখায়। মঙ্গলবার ওই দুটি স্থানের পাশাপাশি ফার্মগেইট, মতিঝিল, শ্যামলী ও কাকরাইল এলাকায়ও সড়ক অবরোধ হয়; ভাংচুর হয় কিছু গাড়িও।  

এর মধ্যেই মঙ্গলবার দুপুর থেকে ঢাকার বিভিন্ন সড়কে বাসের সংখ্যা কমে যায়। মিরপুর, শ্যামলী, মহাখালী, বিজয় সরণি, উত্তরা, ফার্মগেইট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। কয়েকটি বাস এলেও তাতে সবাই উঠতে পারছেন না।

দুপুরে মহাখালী ফ্লাইওভারের পাশে উত্তরার বাসের অপেক্ষায় থাকা মোঃ আবদুল্লাহ বলেন, ‘অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো বাস পাচ্ছি না। এতে চরম ভোগান্তিতে রয়েছি।’ মিরপুরের বাসিন্দা আশরাফুল আলমের কথায় ফুটে উঠলে গণপরিবহন কম থাকার কথা।

‘অন্যান্য দিন গাড়িতে মিরপুর থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় যেতে কয়েক ঘণ্টা লাগে। আজ রাস্তা ফাঁকা অনেকটাই। মাত্র ২০ মিনিটে বসুন্ধরায় পৌছালাম।’

সড়কে শিক্ষার্থীরা থাকায় এয়ারপোর্ট সড়কে ফ্লাইওভারেও বাস দেখা যাচ্ছে না। বাস কম থাকার কারণ জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ খান বলেন, ভাংচুরের কারণে চালকরা বাস চালাতে চাইছেন না।  

‘সড়কে বাস বের করলেই সেগুলো ভাংচুর করা হচ্ছে। এজন্য সকালে বাস বের হলেও নিরাপত্তার কারণে বাসগুলো রাস্তা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভয়ে বাস চালকরা রাস্তায় বাস বের করতে চাচ্ছেন না।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বাস ভাংচুরের প্রতিবাদ জানান। তিনি  বলেন, ‘শিক্ষার্থী মৃত্যুর ঘটনায় আমরাও দুঃখ প্রকাশ করছি, যারা এই ঘটনায় জড়িত তাদের বিচার আমরাও চাই।

‘তাই বলে রাস্তায় কোটি কোটি টাকার গাড়ি বের হলেই সেটা ভাঙবে, এটা কেমন কথা? প্রশাসনও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।’


সকাল থেকে উত্তরা, ঢাকা কলেজের সামনে, শ্যামলী ও স্টাফ রোডে বহু গাড়ি ভাঙা হয়েছে বলে দাবি করেন এই পরিবহন শ্রমিক নেতা। তিনি বলেন, ‘গাড়ি ভাঙার পেছনে কারা আছে, তাদের আসল উদ্দেশ্য কী? সেটা প্রশাসনের কাছে আমরা জানতে চাই।’ বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের; তিনি দোষী চালকদের বিচারের আশ্বাসও দিয়েছেন।

দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর দোষী চালকের ফাঁসিসহ নয় দফা দাবি জানিয়েছে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা।

তারা পরিবহন শ্রমিক নেতা ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে, রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করার দাবিও রয়েছে তাদের। শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মী হলেও ভাংচুরে উদ্বেগ জানিয়েছেন শ্যামলীতে বাসের অপেক্ষায় থাকা নাসরিন সুলতানা।

তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিচার পুরো দেশবাসী চায়। কিন্তু যেভাবে বাস ভাংচুর করে ভয় তৈরি করা হচ্ছে, সেটা খুবই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

আরো পড়ুন : শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহবান কাদেরের
নিজস্ব প্রতিবেদক
নেতিবাচক রাজনীতির জন্য জনগণ বিএনপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে মন্তব্য করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নির্বাচনে যেমন তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছে, তেমনি জনগণ তাদের আন্দোলনকেও প্রত্যাখ্যান করবে।

মঙ্গলবার দুপুরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডি রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় তিনি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের রাস্তা ছেড়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ারও আহ্বান জানান। 


ওবায়দুল কাদের বলেন, আমরা আগেরবার ক্ষমতায় থাকতে ৫টি সিটি করপোরেশনে বিএনপি প্রার্থীরা জয় লাভ করেছে। এবার আমরা ৪টিতে জিতেছি তারা জিতেছে একটিতে। তারা এবার ১/৫ অংশে জিতেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ৯০ ভাগ আমরা জয় করেছি। এর অর্থ সিটির ৫ ভাগের ৪ ভাগ জনগণ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন উন্নয়ন ও অর্জনের রাজনীতিকে গ্রহণ করেছে। বিএনপির নেতিবাচক রাজনীতিকে বর্জন করেছে। জনগণের ওপর বিএনপির কোন আস্থা নেই। কাজেই তারা কি করে প্রত্যাশা করে জনগণ তাদের ভোট দেবে।

সিলেটে বিএনপির প্রাথপ্রর জয়ের কথা উলেøখ করে মন্ত্রী বলেন, নির্বাচনে নেমে বিএনপি গত কয়েকদিন নাটক আর তামাশা, তামাশা আর নাটক করেছে। সিলেট সিটি করপোরেশনে বিএনপির প্রার্থী পাশ করেছে। আমরা তাকে অভিনন্দন জানাই। সেখানে আমাদের সাংগঠনিক দূর্বলতার কারণেই তাদের প্রার্থী জয়লাভ করেছে। আমরা জানতে চাই বিএনপি প্রার্থী কি সেখানে পুন:নির্বাচন চান?

আগামী জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে কাদের বলেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের অধিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যদি একটা রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তবে সেখানে আমাদের কিছুই করার নেই।

সড়ক দুর্ঘটনায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শান্ত হয়ে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, সরকার এ বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। আমরা চুপ করে বসে নেই। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। বিচারের সম্মুখীন করা হবে। আমি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বলবো-ক্লাসে ফিরে যাও, তোমরা শান্ত হও, পড়াশুনায় মনোযোগী হও।

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, দপ্তর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সবুর, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপদপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া প্রমুখ।

আরো পড়ুন : ‘আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেন বাহিরে?’
নয়া দিগন্ত অনলাইন রাজধানীতে বাসচাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় টানা তৃতীয় দিনের মতো বিভিন্ন রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে রাজধানীর সর্বত্র।

 সকাল ১০টার দিকে র‌্যাডিসন হোটেলের সামনের রাস্তায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীরা।শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে রাস্তায় অবস্থান নেন। ‘ আমার ভাই কবরে, খুনিরা কেন বাহিরে?’ , ‘আমার বোন কবরে, খুনিরা কেন হাসে?’।

অন্যদিকে একই সময় ফার্মগেট এলাকায় বাবুল টাওয়ারের সামনে সরকারি বিজ্ঞান কলেজসহ স্থানীয় কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা অবস্থান নেয়।

সাইন্সল্যাব এলাকায় সিটি কলেজসহ বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। তারা নিরাপদ সড়ক ও কলেজ শিক্ষার্থীদের হত্যাকারী চালকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানায়।

রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মতিঝিলে নটরডেম ও মতিঝিল আইডিয়েল স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে রাস্তায় নেমে আসে।

গত রোববার জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস গত রোববার বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিমানবন্দর সড়কের জিল্লুর রহমান ফ্লাইওভারের গোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই দুজনের মৃত্যু হয়।

নিহতরা হলেন- শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের মানবিক শাখার দ্বাদশ শ্রেণির আবদুল করিম এবং একাদশ শ্রেণির দিয়া খানম।

ঘটনার পর ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেরিয়ে এসে যানবাহনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে।

এ ঘটনায় দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর আলম রোববার রাতে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে হত্যার অভিযোগ আনা হয় ওই মামলায়।

ওই ঘটনায় সোমবারও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের এলাকায় শিক্ষার্থীরা ঢাকার বিমানবন্দর সড়কের দুই দিক অবরোধ করে কয়েক ঘণ্টা বিক্ষোভ দেখায়।

এছাড়া গভার্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের শিক্ষার্থীরা মিরপুর সড়ক অবরোধ করে রাখে। 


আরো সংবাদ