২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আবার হাসলেন মন্ত্রী, বললেন পদত্যাগ সমাধান নয়

নৌমন্ত্রী শাজাহান খান - সংগৃহীত

এর আগেও বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনায় একাধিক লোক নিহত হওয়ার পর নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের পদত্যাগ দাবি করেছে সাধারণ মানুষ। এতে কাজের কাজ কিছু না হয়ে পুরো ঘটনা পরিণত হয়েছে প্রহসনে। রোববার বিমানবন্দরে বাসচাপায় দুই স্কুলশিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর শাজাহান খান ভারতের একটি দুর্ঘটনার সাথে তুলনা করে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর বিষয়টি হাল্কা করার চেষ্টা করেন। এতেই নতুন করে তার পদত্যাগের দাবি উঠে। আর এই দাবির কথা শোনেই মন্ত্রী হেঁসেছেন। মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করলেই সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে কি না- প্রশ্ন তুলে নৌমন্ত্রী বলেন, ‘সব সমস্যা সমাধান হলে, আমার যেতে তো কোনো অসুবিধা নেই। পদত্যাগ সমস্যার সমাধান নয়।’

শাজাহান খান পরিবহন শ্রমিকদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও শাজাহান খানকে প্রায়ই পরিবহন শ্রমিকদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে স্বোচ্ছার দেখা যায়।

রোববার দুপুরে রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হন। একই ঘটনায় আহত হন আরও ১১/১৫ শিক্ষার্থী। রোববার এই দুর্ঘটনার বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নৌমন্ত্রীর হাসির ছবি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে, পদত্যাগ চাইছেন শাজাহান খানের।

সোমবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে নৌমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাবালে নূর গাড়িতে গতকাল দুই ছাত্র নিহত হন। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক এবং দুঃখজনক। দুঃখজনক বললেই শেষ হবে না, আমি গতকালও বলেছি, আজও (সোমবার) বলতে চাই যারা প্রকৃতপক্ষে দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এগুলোকে তো কেউ সমর্থন করবে না।’

‘যারা দোষী তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলে আমাদের মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ আমরা করতে রাজি নই। এসবের দায়-দায়িত্ব আমরা নেব না।’

পদত্যাগের দাবির বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে শাজাহান খান বলেন, ‘আমি ছাত্র বন্ধুদের বলতে চাই, পদত্যাগ করলেই কী এই সমস্যা সমাধান হবে। বাংলাদেশে দুর্ঘটনা কমানোর জন্য যত কার্যক্রম বিভিন্ন সরকারের সময়ে আমার নেতৃত্বে করতে পেরেছি, প্রত্যেকটি সরকারের সময়ে দুর্ঘটনা হ্রাস পেয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনা ঘটলেই অনেকে আমার পদত্যাগ দাবি করেন। আমি তাদের অনুরোধ করব এবং বলব, আপনারা যদি বলতে পারেন হ্যাঁ, আপনি গেলেই সব সমস্যা সমাধান হবে, আমার যেতে তো কোনো অসুবিধা নেই। পদত্যাগ সমস্যার সমাধান নয়।’

ছাত্রদের রাস্তা আটকে বিক্ষোভ করার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্র বিক্ষোভ তো হতেই পারে। যে কোনো ঘটনায় যারা সংক্ষুব্ধ হবেন তারা তো বিক্ষোভ প্রদর্শন করতেই পারেন। আমি তো তাদের এই বিক্ষোভকে অমূলক বলব না। এর বিরুদ্ধেও আমার কিছু বলার নেই।’

‘শুধু এটুকু বলব, একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে, আমাদের দায়িত্ব হল কীভাবে এই দুর্ঘটনার সাথে যারা জড়িত তাদের বিচারের ব্যবস্থা করা। আমি ছাত্রবন্ধুদের আশ্বস্ত করতে চাই- এর কঠোর বিচারের ব্যবস্থা হবে। ছাত্রবন্ধুদের বলব, আপনারা অপেক্ষা করুন, আমরা কী করছি দেখেন।’

নিহত ছাত্রীর পিতা একজন গাড়িচালক বলেও জানান নৌমন্ত্রী।

ঢাকায় মিনিবাস চালকরা কোনো শৃঙ্খলা মানে না- এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শাজাহান খান বলেন, ‘এ বিষয়ে আমিও একমত। আমরা ওটা নিয়ে কালকে সিরিয়াস সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। আমরা কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেব।’

তিনি বলেন, ‘গত সাড়ে ৩ বছরে একটি লঞ্চও ডুবেনি, তাহলে এটা আমি করতে পারি, সড়ক পরিবহনেও আমার প্রচেষ্টার মাধ্যমে এটা (দুর্ঘটনা) হ্রাস করতে পারব।’

মালিককে চেনেন না মন্ত্রী

দুর্ঘটনা ঘটানো জাবালে নূর পরিবহনের মালিক নৌমন্ত্রীর শ্যালক- প্রকাশিত এমন সংবাদের বিষয়ে জানতে চাইলে শাজাহান খান বলেন, ‘জানি না তো, কোন গাড়ি কার, এগুলো আমার জানা নেই। গাড়ির কোম্পানিগুলো সব চিনিও না। কার গাড়ি কোনটা আমি জানি না। আমি আদৌ চিনি না। আমি খবর নেব।’

তাহলে ওই গাড়ির মালিক আপনারা শ্যালক নয়- ফের প্রশ্ন করা হলে শাজাহান খান বলেন, ‘আমি জানি না ঠিক, জোর দিয়ে বলছি না। এটা তো একটা কোম্পানি, এতে ১০-২০ জন মালিক থাকতে পারে। ব্যবসা আমার ভাইয়েরা করে। গাড়ি ব্যবসা আমাদের আদি ব্যবসা, ১৯৬২ সাল থেকে আমাদের গাড়ির ব্যবসা।’

মালিক-শ্রমিকদের নিয়ে সভা

শাজাহান খান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তিনজন মন্ত্রীকে সমন্বিত করে দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি কিন্তু নৌমন্ত্রী হিসেবে এই দায়িত্ব পাইনি। আমি দীর্ঘদিন পরিবহন সেক্টরে রাজনীতি করি।’

তিনি বলেন, ‘পরিবহন সেক্টরে যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলো নিয়ে আমরা মালিক-শ্রমিকরা আগামীকাল বসব। আমাদেরও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে। যে দায়িত্বগুলো নেয়ার জন্য আমরা মালিক-শ্রমিকরা একমত হয়েছি। আগামীকাল সন্ধ্যায় মিটিং করে চালকদের একটা মেসেজ আমরা দিতে চাই।’

তবে সভার স্থান এখনও ঠিক হয়নি বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ‘যে জন্য প্রধানমন্ত্রী কমিটি করে দিয়েছেন সেই বিষয়ে প্রাথমিক কাজটা করার জন্য ইতোমধ্যে সচিব পর্যায়ে একটি সভা হয়েছে। প্রাথমিক কাজ হওয়ার পর সেতুমন্ত্রী আমাদেরসহ বসবেন।’

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ড. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছিল জানিয়ে শাজাহান খান বলেন, ‘সেই কমিটি ৮৫টি সুপারিশ দিয়েছিল। এই বিষয়ে আমরা সতর্ক হচ্ছি। ৮৫টি সুপারিশের মধ্যে অনেকগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে। আরও বাস্তবায়ন করতে হবে। সেগুলো নিয়েও আমরা মালিক শ্রমিকরা বসব, যাতে এগুলো দ্রুত কীভাবে আমরা কার্যকর করতে পারি।’

মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কোনো কথা হয়েছি কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আজকে কোন কথা হয়নি। এটা নিয়ে ক্যাবিনেটে কোন কথা হয়নি।’

আন্তর্জাতিক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের চেয়ে ভারত, পাকিস্তানে দুর্ঘটনার হার বেশি। দুর্ঘটনা আগের তুলনায় কমে এসেছে বলেও দাবি করেন নৌমন্ত্রী।


আরো সংবাদ