২৩ অক্টোবর ২০১৮

ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ট্রেন সিডিউল, বাস্তবে বিপরীত

ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ ট্রেন সিডিউল, বাস্তবে বিপরীত - নূর হোসেন পিপুল

বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঈতে ট্রেনের যাত্রা নির্বিঘ্ন ও ঝামেলামুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করলেও বাস্তবে তেমনটা হয়নি। গত বছরের মতো এবারো ঢাকার কমলাপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্টেশনে ঝাক্কিঝামেলা আর শিডিউল বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়েই তাদেরকে বাড়ির পথে রওয়ানা হতে হয়েছে।

ঢাকার কমলাপুর স্টেশনে আগাম টিকেটের যাত্রীরা প্রথম ২দিন স্বাচ্ছন্দ্য ট্রেনে চড়ে গন্তব্য রওয়ানা হতে পারলে বুধবার থেকে শুরু হয়েছে ভোগান্তি আর ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়। যা বৃহস্পতিবারও অব্যাহত। যার কারণে হাজার হাজার মানুষকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্টেশনে চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়েছে।

এবারের ট্রেন যাত্রায় বৃহস্পতিবার ছিলো কমলাপুর স্টেশনে উপচেপড়া ভীড়। এদিন অনেক ট্রেনেরই শিডিউল ঠিক ছিলো না। যার দরুন বেশীরভাগ ট্রেন বিলম্বে ছেড়ে গেছে। শুধু বৃহস্পতিবার নয়, আগের দিন অর্থাৎ বুধবারও ১২টি ট্রেন বিলম্বে ছেড়ে গেছে।

কমলাপুর স্টেশন সুত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত সোয়া ১০টায় লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনটি ছাড়ার কথা থাকলেও সেটি রাত পৌণে ২টার পর স্টেশন ত্যাগ করেছে। আর ওই ট্রেনের টিকেট কাটা যাত্রীদের অনেকগুলো সিটই বিনা টিকেটের ও স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটা যাত্রীরা দখল করে রাখেন। এতে ট্রেন ছাড়তে বিলম্ব হয়। পরে কমলাপুর স্টেশনের ম্যানেজার সীতাংশু চক্রবর্তীর নেতৃত্বে রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল প্রথমে বগি থেকে নেমে যেতে মাইকিং করে। না শোনায় হালকা লাঠিচার্জ করা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এরপরই প্রথম শ্রেনীর বগির টিকেট কাটা যাত্রীরা তাদের সিটে বসতে সক্ষম হন।

বৃহস্পতিবার কমলাপুর ও বিমানবন্দর স্টেশনে খোজ নিতে গেলে দেখা যায়, সকাল থেকেই মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এদিন অনেক ট্রেন নির্ধারিত সময়ের পরে স্টেশনে প্রবেশ করে। যার কারণে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া বেশিরভাগ ট্রেন ছেড়েছে দেরিতে।

টিকিট কাটা যাত্রীরা অভিযোগ করে বলছেন, অনেক কষ্ট করে ট্রেনের টিকিট কেটেছেন। তারপরও রীতিমত যুদ্ধ করে ট্রেনে চড়তে হয়েছে। বগির ভেতর শুধু করিডোরে নয়, সিটের হাতলেও অনেক যাত্রীকে বসতে হয়েছে। ফলে নড়াচড়া করার সুযোগও ছিল না তাদের।

বৃহস্পতিবার লালমনিরহাটগামী ঈদ স্পেশাল এবং খুলনাগামী সুন্দরবন ট্রেন দুটি নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক ঘণ্টা পর স্টেশন ছেড়ে যায়। লালমনিরহাটের লালমনি ঈদ স্পেশাল ট্রেন বেলা সোয়া ৯টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা। ছাড়ে বেলা ১১টায়। রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেন সকাল ৯টায় ছাড়ার কথা থাকলেও তা সকাল ১০টা ১০ মিনিটে ছেড়েছে। নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের ছাড়ার সময় সকাল ৮টায়। আধাঘণ্টা দেরি করে সকাল সাড়ে ৮টায় ছেড়ে গেছে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ার তিতাস কমিউটার ট্রেন সকাল সাড়ে ৯টার পরিবর্তে বেলা ৯টা ৫০ মিনিটে ছেড়ে গেছে। জামালপুরের তারাকান্দি রুটের অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেন আধাঘণ্টা দেরি করে সকাল সোয়া ৯টায় ছেড়েছে। এছাড়া দিনাজপুরের একতা এক্সপ্রেস ২০ মিনিট দেরি করে বেলা ১০টা ২০ মিনিটে ছেড়েছে। ৫৯টি ট্রেন কমলাপুর থেকে বিভিন্ন গন্তব্য ঢাকা ছাড়ে। বৃহস্পতিবার পাঁচটি বিশেষ ট্রেনসহ মোট ৬৯টি ট্রেন ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়ার শিডিঊল নির্ধারন করা রয়েছে।

কমলাপুর স্টেশনে স্বজনদের সিল্কসিটি এক্সপ্রেসে তুলে দিতে এসেছিলেন সেগুনবাগিচা থেকে রাসেল আহমেদ। তিনি বলেন, সিল্কসিটি ২টা ৩০ মিনিটে ছাড়ার কথা। কিন্তু সেটি ছেড়ে গেছে ৫টা ৪৫ মিনিটে। এই সময় পর্যন্ত শুধু ভোগান্তি আর ভোগান্তি। অনেকে গেছে ঝুইল্ল্যা মুইল্ল্যা। একই অবস্থা দেখেছি কিশোরগঞ্জগামী ট্রেনে। এটি বেলা ৩টা ৩০ মিনিটে ছাড়ার কতা। কিন্তু ছেড়েছে ৫টা ২০ মিনিটে। প্রতিবারই স্টেশনে কেনো এমন সমস্যা হয় বলে তিনি আপেক্ষ করেন। এরআগে বুধবার রাত ১টায় কমলাপুর স্টেশনের ৭ নম্বর প্লাটফরমে দেখা যায়, লালমনি এক্সপ্রেস ট্রেনের ভেতরে ও ছাদে হাজার হাজার যাত্রী ঠায় বসে থাকলেও ট্রেন ছাড়ছে না। এই ট্রেনটি রাত ১০টায় ছাড়ার শিডিউল ছিলো। কিন্তু সেটি রাত পৌণৈ ২টার পরে ছেড়ে যায়।

স্টেশনে এ প্রতিবেদক দেখতে পান প্রথম শ্রেনীর একটি বগিতে যাদের সিট তাদের অনেকেই নির্ধারিত সিটে বসতে পারেননি। এগুলো দখল করে ফেলে বহিরাগত (সিট ছাড়া) ও স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটা যাত্রীরা। পরে বিষয়টি স্টেশন ম্যানেজারকে জানালে তিনি এসে আরএনবিকে নির্দ্দেশ দেন দ্রুত বগি খালী করতে। পরে আরএনবির সদস্যরা মাইকিং করে বলতে থাকেন, আপনাদের যাদের টিকেট নাই তারা দ্রুত নেমে পড়েন। নতুবা আমরা ব্যবস্থা গ্রহন করতে বাধ্য হবো। এরপরই লাঠি হাতে নিরাপত্তাকর্মীরা প্রথম শ্রেনীর নন এসি বগিতে উঠে মৃদ্যু লাঠিচার্জ শুরু করেন।

এরপরই টিকেট ছাড়া যাত্রীরা নামতে বাধ্য হন। তবে আইন শৃংখলাবাহিনীর সামনেই শত শত নারী পুরুষ ট্রেনের ছাদে বসে থাকতে দেখা যায়। এসময় ছাদের কোনায় ঝুকিপূর্ণ অবস্থায় বসে থাকা এক যাত্রী এ প্রতিবেদককে বলেন, এই প্রথম ট্রেনে বাড়িতে যাচ্ছি ঈদ করার জন্য। টিকেট পাচ্ছি না। কোন উপায় নেই। বাড়িতো যেতেই হবে। যাক যা হওয়ার হবে। তবে কমলাপুর স্টেশনে গতবছরে চেয়ে এবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা কড়াকড়ি থাকলেও প্রধান গেটে দায়িত্বরত আরএনবি’র সদস্যদের চোখ ফাকি দিয়েই বিনা টিকেটের শত শত যাত্রী কৌশলে ভেতরে ঢুকে পড়ে। যার কারণে টিকেট কাটা যাত্রীদের সিটে বসতে সমস্যা হয়েছে। এটি নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হলে ঘরমুখোদের নির্ধারিত আসনে বসে গন্তব্য যেতে কোন ধরনের অসুবিধা হবে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

কমলাপুর স্টেশনের ব্যবস্থাপক সিতাংশু চক্রবর্ত্তী বলেন, কয়েকটি ট্রেন সামান্য দেরি করেছে। দুয়েকটি ট্রেনে দেরি হলেও একে শিডিউল বিপর্যয় বলা যাবে না। তবে ঈদের সময় ১৫-২০ মিনিট দেরি করে যাওয়া বড় কিছু নয় বিষয় নয়, আমাদের কাছে আগে যাত্রীদের নিরাপত্তা। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে নির্ধারিত গতির চেয়ে কমগতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে। তাছাড়া প্রতিটি ট্রেনই অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। এক একটি স্টেশনে নির্ধারিত যাত্রার চেয়ে অতিরিক্ত সময় দিতে হচ্ছে। প্রচন্ড ভিড়ে যাত্রীদের ওঠানামায় বেশি সময় লাগছে। ট্রেনের সিডিউল বিপর্যয় নিয়ে জানতে চাইলে রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরী। এক ঘণ্টা কিংবা ৩০ মিনিট বিলম্বে ট্রেন চলাচল করাটাকে খুব একটা দুর্ভোগ বলা যাবে না।


আরো সংবাদ