২২ জুন ২০১৮

দুই বছরেও মিতু হত্যার অভিযোগপত্র তৈরী করতে পারেনি পুলিশ

মাহমুদা আক্তার মিতু (বাঁয়ে), বাবুল আক্তার - সংগৃহীত

দুই বছর গড়ালেও আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত শেষ করে আদালতে অভিযোগপত্র দিতে পারেনি পুলিশ। বহুল আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র তৈরির কাজ প্রায় ‘শেষ পর্যায়ে’ বলে পুলিশ জানালেও কবে নাগাদ তা দেওয়া হবে, তার ঠিক নেই।  

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (উত্তর) মোঃ কামরুজ্জামান বলছেন, ‘অভিযোগপত্র তৈরির কাজ চলছে। কিছু কাজ বাকি আছে। তাই এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’ তবে ‘শিগগিরই’ অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হবে বলে জিজ্ঞাসায় জানিয়েছেন তিনি। অভিযোগপত্রে স্বামী বাবুলের সম্পৃক্ততার বিষয়ে কিছু থাকছে কি না, জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কিছুই বলতে চাননি।

মিতুর পরিবার শুরুতে এক রকম বললেও পরে হত্যাকাণ্ডে বাবুলের সম্পৃক্ততার সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে তাকে চট্টগ্রামে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছিল। ২০১৬ সালের ৫ জুন ভোরে চট্টগ্রাম নগরীর জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুল বাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় খুন হন জঙ্গিবিরোধী নানা অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া পুলিশ কর্মকর্তা বাবুলের স্ত্রী মিতু।

পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে যোগ দেওয়ার আগে বাবুল চট্টগ্রাম নগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম ছাড়ার কয়েক দিনের মধ্যে খুন হন মিতু। হত্যাকাণ্ডের পর পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতদের আসামি করে একটি মামলা করেন বাবুল। জঙ্গি দমন অভিযানে বাবুলের নেতৃত্বের কারণেই মিতু খুন হন বলে প্রথমে ধারণা করা হলেও কিছু দিন পর তদন্ত নতুন দিকে মোড় নেয় বাবুলের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসার পর। এর পরিপ্রেক্ষিতে নানা নাটকীয়তার মধ্যে তিন মাস পর পুলিশের চাকরি ছাড়েন বাবুল।

তদন্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামান আগের মতো সোমবারও  বলেন, ‘মামলার তদন্তে আমাদের অবশ্যই অগ্রগতি আছে। তবে তদন্তনাধীন বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা যাবে না।’ হত্যাকাণ্ডের পর বাবুলের পক্ষেই কথা বলেছিলেন তার শ্বশুর অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন। দুই সন্তানকে নিয়ে বাবুল ঢাকায় তখন ছিলেন শ্বশুরের বাড়িতে। বাবুল সন্তানদের নিয়ে শ্বশুর বাড়ি ছাড়ার পর জামাতার বিরুদ্ধে সন্দেহের আঙুল তোলেন মোশাররফ। বাবুলের পৈত্রিক এলাকার এক নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কের অভিযোগ তোলেন শ্বশুরবাড়ির লোকজন।

মোশাররফ এখনও মনে করেন, তার মেয়েকে হত্যায় জামাতা বাবুল জড়িত ছিলেন।

অবসরপ্রাপ্ত এই পুলিশ পরিদর্শক সোমবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘বাবুলকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। তাদের কাছে মিতুর হত্যার বিষয়ে স্বীকার করায় বাবুলকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

বাবুল চাকরিতে ফিরতে চেয়েও বিফল হয়েছিলেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘এ থেকেই বোঝা যায়, মিতু হত্যার সাথে বাবুল জড়িত ছিল।’

মোশাররফ বলেন, ‘আমরা শুনেছি বাবুলকে বাদ দিয়ে অভিযোগপত্র তৈরি করা হচ্ছে। আমরা চাই বাবুলকে ‍নিয়েই অভিযোগপত্র দেওয়া হোক।’ মামলার বিষয়ে কথা বলতে বাবুলের মোবাইল ফোনে সোমবার একাধিকবার ফোন করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।

বাবুল বরাবরই স্ত্রী হত্যাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ নাকচ করে আসছেন। তিনি গত বছর ক্ষোভ জানিয়ে ফেইসবুকে লিখেছিলেন- ‘সবাই বিচারক, আর আমি তথ্য প্রমাণ ছাড়াই খুনি।’ মিতু হত্যাকাণ্ডের পরের মাসে ২৪ জুন ঢাকার বনশ্রীর শ্বশুরের বাসা থেকে বাবুলকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল।  

এরপর ২৬ জুন মোঃ আনোয়ার ও মোঃ মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় চট্টগ্রাম পুলিশ। ওয়াসিম ও আনোয়ার আদালতে দেওয়া জবানবন্দি উদ্ধৃত করে পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, কামরুল ইসলাম শিকদার ওরফে মুছার ‘পরিকল্পনাতেই’ এ হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়।

ওয়াসিমের দাবি অনুযায়ী, তিনি ছাড়াও নবী, কালু, মুছা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটি বাবুল আক্তারের ‘সোর্স’ হিসেবে পরিচিত নগরীর বাকলিয়া এলাকার এহেতেশামুল হক ভোলা সরবরাহ করেছিলেন। এরপর পুলিশ বাকলিয়া এলাকা থেকে ভোলা ও তার সহযোগী মনির নামে এক ব্যক্তিকে পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি পিস্তলসহ গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে বলে, এই পিস্তলটিই মিতু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল।

পুলিশের পক্ষ থেকে ভোলা ও মনিরকে আসামি করে অস্ত্র আইনে একটি আলাদা মামলা হয়। মিতু হত্যা মামলায়ও গ্রেপ্তার দেখানো হয় ভোলাকে। অস্ত্র মামলায় পুলিশ ভোলা ও মনিরকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় এবং গত ২২ নভেম্বর আদালতে মামলাটির বিচার শুরু হয়।

সম্প্রতি ভোলা উচ্চ আদালত থেকে জামিন পান। পরে তাকে নার্সিং শিক্ষিকা অঞ্জলী হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দেখায় গোয়েন্দা পুলিশ।

ভোলা ছাড়াও পুলিশ মিতু হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘মোটর সাইকেল সরবরাহকারী’ মুছার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাকু, মোঃ শাহজাহানকে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এই হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার দুই আসামির দেওয়া জবানবন্দিতে যাদের নাম এসেছিল, তাদের মধ্যে নুরুল ইসলাম রাশেদ ও নুরুন্নবী নামে দুজন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

মুছাকে পুলিশ ধরে নিয়েছে বলে তার স্ত্রী দাবি করলেও পুলিশ তা স্বীকার করেনি।

ঘটনাক্রম

>> ৫ জুন সকালে খুন হন মাহমুদা আক্তার মিত; কুপিয়ে ও গুলি চালিয়ে তাকে হত্যা করা হয় প্রকাশ্য সড়কে।

>> পরদিন ৬ জুন ভোরে চকবাজার বড় গ্যারেজ এলাকা থেকে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটর সাইকেলটি উদ্ধার করে।

>> বাবুল আক্তার ওই দিন বাদী হয়ে পাঁচলাইশ থানায় একটি হত্যামামলা করেন।

>> ৮ জুন ও ১১ জুন গোয়েন্দা পুলিশ হাটহাজারী উপজেলা থেকে আবু নসুর গুন্নু ও বায়েজিদ বোস্তামী থানার শীতল ঝর্ণা থেকে শাহ জামান ওরফে রবিন নামে দুজনকে গ্রেপ্তারের খবর জানায়। যদিও পরে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিতু হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা নেই।

>> ২৪ জুন রাতে ঢাকার বনশ্রীর শশুর বাসা থেকে বাবুল আক্তারকে ঢাকা গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে প্রায় ১৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে।

>> ২৬ জুন মো. আনোয়ার ও মো. মোতালেব মিয়া ওরফে ওয়াসিম নামে দুজনের গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করে পুলিশ। ওইদিন তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

>> ২৮ জুন বাবুল আক্তারের অন্যতম সোর্স এহেতাশামুল হক ভোলা ও তার সহযোগী মো. মনিরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পয়েন্ট ৩২ বোরের একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

>> ১ জুলাই মোটর সাইকেল সরবরাহ করার অভিযোগে মুছার ভাই সাইদুল আলম শিকদার ওরফে সাক্কু ও শাহজাহান নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

>> ৪ জুলাই মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে মুছাকে আদালতে হাজির করার দাবি করেন। ২২ জুন বন্দর থানা এলাকায় তাদের এক পরিচিত জনের বাসা থেকে মুছাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

>> ৫ জুলাই ভোরে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার ঠাণ্ডাছড়িতে নুরুল ইসলাম রাশেদ ও নুরুন্নবী নামে দুইজন পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

>> ১৩ অগাস্ট স্ত্রীকে নিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে নিজের নিরবতা ভাঙেন বাবুল আক্তার।

>> ৬ সেপ্টেম্বর বাবুল আক্তারকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

>> ১ নভেম্বর ঢাকার বেসরকারি আল-দ্বীন হাসপাতালে সহযোগী পরিচালক হিসেবে বাবুল আক্তার যোগদান করেন।

>> ২২ নভেম্বর অস্ত্র মামলায় ভোলা ও মনিরকে অভিযুক্ত করে পুলিশের দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদন আদালত গ্রহণ করে বিচার শুরু করে।

>> ১৫ ডিসেম্বর তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে চট্টগ্রাম আসেন বাবুল আক্তার।

>> এ বছরের ২ জানুয়ারি বাবুলের বাবা-মা ও ২৬ জানুয়ারি শ্বশুর মোশাররফ হোসেন ও শ্বাশুড়ি সাহেদা মোশারফ নীলা চট্টগ্রাম এসে দেখা করেন তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে।

 

 


আরো সংবাদ