২০ জুন ২০১৮

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কেন?

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট কেন? - ফাইল ছবি

বাংলাদেশে বিভিন্ন মহাসড়কগুলোতে যানজট নতুন কিছু নয়। দিনের পর দিন এসব যানজটে ভোগান্তিও অনেক। যাত্রা শুরুর পর কখন গন্তব্যে পৌঁছবেন তার কোন নিশ্চয়তা নেই। সাম্প্রতিককালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ঘন ঘন যানজট তৈরি হওয়ায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষসহ সকলেই। কিন্তু মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত হওয়ার পরও কেন বারবার যানজটে ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে? এর বাণিজ্যিক ক্ষতিই বা কতটা?

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট পরিস্থিতি দেখতে কয়েকদিন আগে আমি (বিবিসির এই প্রতিবেদক) নিজেই রাজধানী ঢাকা থেকে যাত্রা শুরু করি চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে।

সকাল ১০টায় যাত্রা শুরু করেছিলাম রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে। আধা ঘণ্টা পর রাজধানীর যানজট পেরিয়ে উঠলাম মহাসড়কে।

পরবর্তী দেড় ঘণ্টায় কাঁচপুর সেতু পার হয়ে পৌঁছলাম নারায়ণগঞ্জের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডে।

এ পর্যন্ত বেশ ভালোয় ভালোয় চলছিলো সবকিছু। তবে মদনপুর বাসস্ট্যান্ড পার হওয়ার পরই প্রথমবারের মতো আমি মুখোমুখি হলাম দীর্ঘ যানজটের।
যতদূর চোখ যায় বাস, ট্রাক লরিসহ শতশত যানবাহন তখন ঠায় দাঁড়িয়ে মহাসড়কে। এগুনোর কোন উপায়ই নেই।

গুগল ম্যাপে দেখলাম, এখান থেকে মেঘনা ব্রিজের দূরত্ব ১৬ কি.মি.। আর এই পুরো পথটাই যানজটে স্থবির।

আজিজুর রহমান নামে এক বাস চালক জানালেন, প্রায় ৪০ মিনিট ধরে তারা একই স্থানে আটকে আছেন। জ্যাম ছাড়ছে না।

আমাকেও অপেক্ষায় থাকতে হলো দীর্ঘ সময়।

অবশেষে যানজট পেরিয়ে যখন মেঘনা ব্রিজ পৌঁছলাম, ততক্ষণে পেরিয়ে গেছে প্রায় দুই ঘণ্টা।

সাধারণ মানুষের ভোগান্তি চরমে। যানজটে আটকে থাকা পণ্যবাহী যানবাহনগুলোর চালকেরাও সময়মত ট্রিপ শেষ করতে না পারা নিয়ে মহা দুঃশ্চিন্তায়।

চট্টগ্রাম থেকে লবনবাহী একটি ট্রাকের চালক তপন সরকার আমাকে বলছিলেন, ''আগের ট্রিপে কুমিল্লার চান্দিনা থেকে মেঘনা ব্রিজ পার হইতে সময় লাগছিলো ১০ ঘণ্টা। আজকে প্রায় ৬ ঘণ্টা শেষ। মালিকের লোক বারবার ফোন দিচ্ছে কতক্ষণে পৌঁছব তা জানতে।''

পাশেই বাসে থাকা এক নারী যাত্রী জানালেন, ''গাড়ি ৫ মিনিট চললে, ৫ মিনিট বসে থাকে। বাধ্য হয়ে আমাদেরও অপেক্ষায় থাকতে হয়। জরুরি প্রয়োজনও সারা যায় না।''

মনে করেছিলাম, ব্রিজের আগে এই যানজটের কারণ টোল আদায়ে ধীরগতি। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

দেখা গেলো, টোল প্লাজার ৮টি লেন থেকে যানবাহনগুলো যখন সেতুর একটি লেনে উঠছে, তখনি সেতুর মুখে নতুন করে তৈরি হচ্ছে যানজট।

যার ফলে শুধু সেতু পার হতেই আমাদের অপেক্ষায় থাকতে হল আরো এক ঘণ্টা।

অবশেষে মেঘনা সেতু পার হলাম। সেতু পার হতেই দেখলাম চার লেনের একটি সংযোগ সড়কের কাজ চলছে।

এবার বোঝা গেলো, মূলত: এই সংযোগ সড়কের নির্মাণ কাজের জন্যই মেঘনা সেতুতে প্রবেশ ও বের হওয়ার রাস্তা সংকুচিত হয়ে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছে।

নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জানালেন, এই প্রজেক্টের কাজ শেষ হবে আগামী বছরের জুলাইয়ে। সে পর্যন্ত যানজট থেকে আপাতত মুক্তি নেই।

যাইহোক, সবমিলিয়ে হিসেব করে দেখলাম ঢাকা থেকে মেঘনা ব্রিজ পার হতে প্রায় ৩৩ কি.মি. রাস্তায় আমার সময় লেগেছে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টারও বেশি।

মেঘনা সেতু পেরিয়ে রাস্তা ফাঁকা। জোর গতিতেই এগোচ্ছি চট্টগ্রামের পানে।

যদিও দেখতে পাচ্ছি, বিপরীত দিকে ঢাকামুখি রাস্তায় কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট।

তবে চট্টগ্রামমুখি রাস্তা ফাঁকা থাকায় পরবর্তী আড়াই ঘণ্টায় আমি অতিক্রম করলাম আরো ১শ কিলোমিটার পথ।

ইতোমধ্যেই সন্ধ্যে নেমে গেছে।

আমি তখন ফেনির ফতেহপুর এলাকায়। সেখানে রেলক্রসিং এর তিন কিলোমিটার আগেই আবারো পড়লাম যানজটের খপ্পরে।

ফেনির ফতেহপুরে চলছে রেলক্রসিং এর উপর দিয়ে ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ। পাশের ছোট রাস্তা দিয়ে চলছে গাড়ি পারাপার।
এই যানজট পেরোতে সময় লেগে গেলো প্রায় দুই ঘণ্টা।

এরই মধ্যে যানজটের কারণ খোঁজার চেষ্টা করি।

দেখতে পাই, ফ্লাইওভার প্রকল্প এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যানবাহনগুলো সরু একটা রাস্তা দিয়ে চলাচল করছে।

এই সরু রাস্তায় যানবাহনগুলোকে ঢুকতে গিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে দীর্ঘসময়। এতেই তৈরি হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট।

কয়েকদিন আগেই এই যানজট ছড়িয়ে পড়েছিলো ১শ কিলোমিটারেরও বেশি।

কিন্তু প্রকল্প এলাকা দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প সড়ক থাকার কথা। এখানেও আছে।

কিন্তু গ্র্যান্ড ট্রাংক নামে সেই সড়ক বৃষ্টিতে চলাচলের অনুপযোগী হওয়াতেই পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তিনি আমাকে জানালেন, গ্র্যান্ড ট্রাংক রোড মেরামত হয়ে গেছে। যানজটও কমে গেছে।

''গত তিনমাস ধরে হঠাৎ করেই আমরা দেখছি সড়কে গাড়ি চলাচল বেড়েছে। প্রতিদিন প্রায় চার হাজার বেশি গাড়ি চলাচল করছে। একদিকে বাড়তি গাড়ির চাপ অন্যদিকে ফেনীর বিকল্প রাস্তা নষ্ট হওয়াতে এই অবস্থা। আবার এই মহাসড়কের তিনটি স্থানে চলছে সেতু নির্মাণের কাজ।''

''মহাসড়কটি চার লেনের হলেও সেতু কিন্তু দুই লেনের। ফলে যানজট হচ্ছে। তবে সেই যানজট আমরা রাতদিন কাজ করে কমিয়ে এনেছি। এসব প্রকল্পের কাজ আগামী বছর নাগাদ শেষ হলেই কিন্তু একটা সমাধান হয়ে যাবে।''

ফেনী পার হওয়ার পর আমরা সামনে এগোতে থাকি।

বাকি পথটা অবশ্য আর যানজটে পড়তে হল না। একটানেই পৌঁছে গেলাম চট্টগ্রামের প্রবেশ মুখে।

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১১টা।

এবার হিসেব মেলানোর পালা। দেখলাম ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌছাতে আমাদের সময় লেগেছে ১৩ ঘণ্টা।

সাধারণত যা পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা লাগার কথা।

এই মহাসড়কে সবসময় যানজট থাকে না এটা ঠিক। তবে যখনি যানজট শুরু হয় তখনি তা পৌঁছে যায় অসহনীয় অবস্থায়।

এটি দেশের মূল বাণিজ্যিক রুট হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ সকলেই।

চট্টগ্রামে পৌঁছে কথা হয়, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মাহবুবুল আলমের সঙ্গে।

ক্ষতির বিষয়ে তিনি একটা ধারণা দিলেন। বললেন, 'আমাদের মালামাল এখন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাসহ অন্যান্য গন্তব্যে পৌছাতে সময় লাগছে দ্বিগুণ। এতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। গাড়ি ভাড়াও বেড়েছে। আমরা হিসেব করে দেখেছি, শুধু এই যানজটের কারণেই কেজি প্রতি বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে গেছে পাঁচ থেকে ছয় টাকা।''


আরো সংবাদ