২১ নভেম্বর ২০১৮

রাজধানীজুড়ে বাসস্টপেজ

চলছে মাসব্যাপী ট্রাফিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি। মতিঝিলে স্কাউটের বাধার মুখেই আইন অমান্য করে বাসে উঠছেন যাত্রীরা -

রাজধানীজুড়ে নির্দিষ্ট স্থানে না থামিয়ে যেখানে-সেখানে বাসে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয় এখন রীতিতে পরিণত হয়েছে। আর এ কারণেই প্রতিনিয়ত চলন্ত বাসে ছুটতে ছুটতে উঠতে গিয়ে যাত্রীদের প্রাণহানি, অঙ্গহানি হচ্ছে। চলন্ত বাস থেকে নামতে গিয়ে চাকায় পিষ্ট হওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। এমন নৈরাজ্য বন্ধে সম্প্রতি পুলিশ কিছু নির্দেশনা জারি করলেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।
গত কয়েক দিন রাজধানীতে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাস নির্দিষ্ট স্থানে না থামিয়ে সড়ক দখল করে যাত্রী তোলা হচ্ছে। এতে যেমন যানজট হচ্ছে, তেমনি সড়কে বিশৃঙ্খলাও বাড়ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও পুলিশ অভিযান চালিয়ে মামলাও করছে। তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি।
ঢাকা শহরে ১৮ বছর আগে ২৯৮টি বাস থামার স্থান চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ধারাবাহিক তদারকির অভাব এবং পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের দাপটে চিহ্নিত স্থানগুলো কাজে আসেনি। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের পর এবার ঢাকা মহানগর পুলিশ বাস থামার ১২১টি স্থান চিহ্নিত করা শুরু করেছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বিশিষ্টজনরাও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছেন গত শনিবার থেকে।
সম্প্রতি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে মাসব্যাপী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বলেন, রাজধানীতে বাস থামানোর ১২১টি স্থান নির্ধারণ করেছি, সেগুলোতে বোর্ড লাগানো হচ্ছে। বাস স্টপেজ ছাড়া কোথাও বাসের দরজা খুলবে না। যাত্রীরাও স্টপেজ ছাড়া অন্যত্র নামতে পারবে না।
পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ বিষয়ে শুধু পরিবহন মালিক ও চালকদের অবহিত করলেই হবে না। চিহ্নিত বাস স্টপেজের অবস্থান কোথায় হবে তা নিয়ে স্থানীয় ট্রাফিক পুলিশ স্থানীয় যাত্রীদের নিয়ে কর্মসূচি নিতে পারে। বাস স্টপেজে যাত্রী তোলা ও নামানোর জন্য বাস মালিকদেরও চালকদের নিয়ে নিয়মিত উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি নিতে হবে।
গতকাল শাহবাগ মোড়ে গিয়ে দেখা গেছে, চারটি সড়কের আটটি লেন এক হয়েছে মোড়ে। শাহবাগ মোড় থেকে আগালেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালের সামনে বাস থামার স্থান রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ ট্রাফিক পুলিশ সেখানে সাইনবোর্ড লাগিয়েছে। বাস থামা শুরু ও শেষের অংশকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে মাঝে মধ্যেই চিহ্নিত করা অংশে বাস থামানো হচ্ছে না। মোড়ে আসার আগে থেকেই যাত্রীদের তোলা হচ্ছে, নামানো হচ্ছে। মতিঝিল থেকে মিরপুরমুখী নিউ ভিশন পরিবহনের কর্মী রফিক মিয়া বললেন, যাত্রীরা আগেই উইঠ্যা পড়ে। যাত্রীর চাপ এইখানে এত বেশি থাকে যে, বাস নির্দিষ্ট স্থানে থামানোর আগেই উইঠ্যা পড়ে।
বাংলামোটরের দিক থেকে শাহবাগ মোড় হয়ে মৎস্য ভবনের দিকে যেতে বাস সাধারণত বারডেম হাসপাতালের সামনে থামে। সেখানেই দীর্ঘদিন ধরে লোকজন বাস স্টপেজ হিসেবে চিনে আসছে। কিন্তু নিরাপত্তা ও পরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সেই স্টপেজ করা হয়েছে ঢাকা ক্লাবের কাছাকাছি। এখন থেকে বাসকে সেখানে গিয়ে থামতে হবে। শুধু সেখানেই নয়, রাজধানীতে এভাবে ১২১টি স্টপেজ করা হবে। এর মধ্যে শুধু ট্রাফিক দক্ষিণ বিভাগেই রয়েছে ৪২টি স্টপেজ।
শাহবাগ ছাড়াও কাজীপাড়া থেকে তালতলা, আগারগাঁও, মহাখালী, গুলশান-১, বাড্ডা হয়ে কুড়িল রুটে চলার সময়ে দেখা গেল, প্রায় ১৯ কিলোমিটার এই পথে মাত্র দু’টি স্থানে বাস থামার স্থান নির্দেশকারী সাইনবোর্ড আছে। সেগুলোতে বাস থামছে না। বেশির ভাগ যাত্রী বাসে উঠছে চলন্ত অবস্থায় কাজীপাড়া ওভারব্রিজের নিচ থেকে। কাজীপাড়ার পর দেখা গেল, শেওড়াপাড়ার হাজী আশ্রাফ আলী হাইস্কুলের গলির সামনে আসার আগেই চলন্ত অবস্থায় যাত্রী তোলা হচ্ছে। সেখানে বাস স্টপেজ লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়েনি।
এভাবে তালতলা, আগারগাঁও, মহাখালী আমতলা, ওয়্যারলেস, টিবি গেট, গুলশান-১-এর গোলচত্বরের এপারে ও ওপারে বাস থামিয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। গুলশান-১ গোলচত্বর পার হওয়ার পর ও গুলশান লেকের পাশে গুদারাঘাটের কাছে আসার আগে বাঁয়ে চোখে পড়ল ‘বাস থামিবে’ লেখা সাদাকালো ছোট নির্দেশক। কিন্তু সেটা রয়েছে গাছপালার আড়ালে। চলন্ত বাস থামানো হয় গুদারাঘাটে, যেখানে বাস থামার কোনো নির্দেশক নেই।
বাড্ডা লিংক রোডে সৈনিক ভবনের সামনে বাসে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছিল যাত্রীরা। মোড়ের পাশে এখান থেকে বাসে ওঠা বিপজ্জনক। এরপরও বাস আসতে না আসতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ে অপেক্ষমাণ লোকজন। উত্তর বাড্ডা হাজী মার্কেটের সামনে বাসটি একটু থামিয়ে ছয়জন যাত্রী নামিয়ে দেয়া হয়। তখন প্রায় দৌড়েই বাসে ওঠে কয়েকজন।
সবচেয়ে বেশি বাস চলাচল করে মিরপুর প্রান্ত থেকে। মিরপুরে ১০ নম্বর গোলচত্বরে কিংবা কালশীতে ‘বাস থামার স্থান’ লেখা সাইনবোর্ড আছে। সেসব স্থানে গতকাল বাস থামতে দেখা যায়নি।
পুলিশের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। রাস্তার সব জায়গায় নজরদারি করা পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে বাসচালক, হেলপার, যাত্রীসহ সবারই সচেতনতা দরকার। বর্তমানে প্রতিটি এলাকায় পুলিশ রয়েছে, তারাই বাসচালক, হেলপার, যাত্রীদের জানাচ্ছে বাস স্টপেজের বিষয়ে। এ ছাড়া লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, ট্রাফিক পুলিশ যে বাস স্টপেজ চিহ্নিত করছে, এ নিয়ে আমাদের সাথে এখনো কোনো কথা বলেনি। আমরা বাস কাউন্টার স্থাপনের জন্য এক সপ্তাহ আগে দুই সিটি করপোরেশনে চিঠি দিয়েছি। তারও কোনো সাড়া পাচ্ছি না।
গত ৫ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীতে মাসব্যাপী ট্রাফিক আইন প্রয়োগ ও ট্রাফিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গতকাল বিভিন্ন বাস স্টপেজে দেখা গেছে, পুলিশের নির্দেশনা অনুযায়ী বাসের গেটগুলো বন্ধ রয়েছে। কয়েক দিনের তুলনায় অনেকটা নিয়ম মেনেই বাস চালিয়েছেন চালকেরা। ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলেছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকার ৪০টি পয়েন্টে ট্রাফিক চেকপোস্ট বসানো হয়েছে। ১৫টি পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশের সাথে রোভার স্কাউটস ও গার্লস গাইডের সদস্য স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সড়কের ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়ির পাশে রোভার সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। তাদের তৎপরতার কারণে ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহারকারীর সংখ্যাও বেশি ছিল।
আশার খবর হলো গত বুধবার থেকেই গুলিস্তানের জিরো পয়েন্ট থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত ট্রাফিক সিগন্যাল বাতির ভিত্তিতে ‘মডেল ট্রাফিক ব্যবস্থা’ চালু করা হয়েছে। অটো সিগন্যালের ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ট্রাফিক-উত্তর) মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, সিগন্যাল মান্য করে গাড়ি চালাতে চালকেরা অভ্যস্ত নন। এ জন্য কিছুটা ঝামেলা হয়েছে। আগামীতে তা পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে। এ ছাড়া এখন পর্যন্ত আগে থেকে নির্ধারণ করা সময় ধরে সড়কে সিগন্যাল বাতিগুলো জ্বলে ওঠে। সেটা মানতে গিয়ে কোনো কোনো রাস্তায় গাড়ির চাপ, আবার অন্য রাস্তায় ফাঁকা দেখা গেছে। তবে শিগগিরই ট্রাফিক সার্জেন্টদের হাতে অটো সিগন্যালের রিমোট কন্ট্রোল দেয়া হবে। তখন পরিস্থিতি বুঝে বাতি জ্বালানো-নেভানো যাবে।॥


আরো সংবাদ