১৯ নভেম্বর ২০১৮

এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি

-

রাজধানীতে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। গতকাল রাজধানীর হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনেরা। প্রচণ্ড জ্বর, বমি, গা-ব্যথা এবং কারও কারও ক্ষেত্রে হাতে-পায়ে ফুসকুড়ি কিংবা র্যাশ ভোগান্তি বাড়াচ্ছে রোগীদের। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় প্রতিদিনই রক্তের খোঁজে ছুটছেন স্বজনরা। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে কিভাবে দূরে থাকা যায়, কী করে সহজে প্রতিকার পেতে পারেন আক্রান্তরা এ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজেদেরই সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছে স্বাস্থ্য অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেয়া তথ্যানুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত (৮ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৩৪৯১ জন। এ সময়ে মারা গেছেন ১১ জন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন (ভর্তি) আছেন ২৪৭ জন। আগস্ট মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১৬৬৬ জন রোগী। আর ১ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ৮ দিনে ৫৭৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জুলাই মাস থেকে এ রোগের প্রকোপ দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি ছিল। ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ২৬৭৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। ২০১৬ সালে দেশে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তখন মারা যায় ১৪ জন।
ন্যাশনাল হেলথ ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট সেন্টার জানায়, যে ২২টি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের তথ্য নিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের হিসাব রাখে সরকার, সেগুলোর মধ্যে আছেÑ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মিটফোর্ড, বারডেম, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিক্যাল কলেজ, বিজিবি, ইউনাইটেড, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক, ইবনে সিনা, ইসলামি ব্যাংক, স্কয়ার, সেন্ট্রাল, খিদমা, এ্যাপোলো, ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ, উত্তরা আধুনিক, সালাউদ্দিন ও পপুলার হাসপাতাল।
এর আগে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) থেকে বলা হয়, ঢাকায় প্রতি বছরের জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশার উপদ্রব বাড়ে। এ সময়কে চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু জ্বরের মওসুম ধরা হয়। এ বছরের জানুয়ারিতে আগাম বৃষ্টি হওয়ায় মশার উপদ্রব আগে থেকেই বেড়ে গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাসমিন বলেন, আমাদের নিয়মিত কাজের অংশই হচ্ছে এডিস মশার সার্ভে করা। আমরা এ সার্ভের রিপোর্ট সিটি করপোরেশনকে দিয়ে দেই, যাতে এডিস মশা প্রতিরোধে সহজে তারা কাজ করতে পারে। গত জানুয়ারি, মে ও আগস্ট মাসের সার্ভে রিপোর্ট ইতোমধ্যেই আমরা সিটি করপোরেশনকে দিয়েছি। ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্টের জন্য আমাদের একটি গাইডলাইন আছে। কিভাবে ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। এটা প্রথম বের হয়েছিল ২০০০ সালে। ২০১৮ সালে এর চতুর্থ সংস্করণ বের করলাম। আমরা চিকিৎসকদের কাছে সফট কপি পাঠিয়ে দিয়েছি। তারপরও বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেসব জায়গায় ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হয়, তাদের আইসিইউর চিকিৎসকদের সাথে মতবিনিময় সভা করেছি। নিয়মিতভাবে সিটি করপোরেশনের সাথে মিটিং হচ্ছে। এ সপ্তাহে আমরা একটা বড় ওয়ার্কশপেরও আয়োজন করব। ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের জন্য আমরা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু কীট সরবরাহ করছি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি না থাকলেও বছর বছর মশা নিধনে বাজেট বরাদ্দ বাড়ছে। রাজধানীর মশা নিধনের দায়িত্ব ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশা নিধনে সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম তেমন একটা কাজে আসছে না। মশার উপদ্রব থেকে রাজধানীর বাসিন্দাদের রক্ষায় দুই সিটি করপোরেশন প্রতি বছর মশা নিধনের জন্য বরাদ্দ রাখে। উদ্দেশ্য ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ করার পাশাপাশি মানুষকে স্বস্তিতে রাখা। গত পাঁচ বছরে মশা নিধনে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বরাদ্দ বেড়েছে ১২২ দশমিক ২২ শতাংশ। সর্বশেষ অর্থবছরে সংস্থাটির বরাদ্দ ছিল ২০ কোটি টাকা। আর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) বরাদ্দ বেড়েছে ১৩৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ২৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
নগর বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মনে করেন, শুধু বাজেট বাড়ালেই মশা নিধন হবে না। বরাদ্দের পুরো ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ঢাকা মহানগরে প্রতিনিয়ত লোকসংখ্যা বাড়ছে। তাই মশা নিধনে দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমও বাড়ানো উচিত।

 


আরো সংবাদ