২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

সড়ক খেঁাঁড়াখুঁড়িতে নাকাল ঢাকাবাসী

-

রাজধানীতে চলাচলে দুর্ভোগ প্রতিনিয়তই বাড়ছে। অলিগলি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে খোঁড়াখুঁড়ি এ দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
গাড়ি চলা তো দূরের কথা, কোনো কোনো সড়কে পায়ে হেঁটে চলাচল করা যাচ্ছে না। শুষ্ক আবহাওয়ায় সড়কে ওড়ে ধুলাবালু, আবার সামান্য বৃষ্টিতে
জলকাদায় একাকার হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সড়ক খনন করে তা পুনর্নির্মাণ না করায় খোঁড়াখুঁড়িজনিত ভোগান্তিতে পড়েছে নগরবাসী।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রাজধানীবাসীর দুর্ভোগ নিয়ে লিখেছেন মাহমুদুল হাসান

রাজধানীজুড়ে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এ ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো ধরনের নিয়মনীতি। কিছু সড়ক খুঁড়ে পাইপ বসানোর কাজ শেষ হলেও এখনো অরক্ষিতই রয়েছে সেগুলো। কিছু গর্তের চার পাশে উঁচু করে পাকা করে রাখা হয়েছে। অনেক সড়কে ম্যানহোলের ঢাকনা মূল সড়ক থেকে নিচে নেমে গেছে। রাস্তার মাঝখানে কেটে পাইপ বসানোর পর কোনো রকম মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে, আইল্যান্ডের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে রাস্তায় চলাচলে প্রতিনিয়ত নানা দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে পথচারীদের।
বছরজুড়েই মূল সড়কসহ অলিগলিতে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলতেই থাকে। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন সংযোগসহ বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠান একের পর এক খোঁড়াখুঁড়ির করেই চলেছে। একটি সংস্থার কাজ শেষ হতে না হতেই চলে আসে আরেকটি সংস্থা। ফলে এক সড়ক একবার নয়, বছরে তিন থেকে পাঁচবারও খনন করা হয়। আর এর ভোগান্তি পোহাতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের। শুধু তা-ই নয়, সড়ক খুঁড়ে রাখার ফলে সৃষ্টি হয় বড় বড় গর্ত। সামান্য বৃষ্টিতে ওই সব গর্ত ভরাট হয়ে পানি জমে যায়, সৃষ্টি হয় কাদা। আর প্রচণ্ড রোদে তা শুকিয়ে গিয়ে ধুলায় পরিণত হয়। বাতাসে মিশে গিয়ে এসব ধুলা মানুষের নাকে-মুখে প্রবেশ করে। ফলে হাঁপানি-অ্যাজমা ও অ্যালার্জিসহ নানা বায়ুবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই। রাজধানীতে এখন এসব রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
গতকাল মগবাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, মগবাজার থেকে মধুবাগ বাজার পর্যন্ত পুরো রাস্তা চলাচলের অযোগ্য। কয়েক মাস ধরে চলমান খোঁড়াখুঁড়িতে ভোগান্তির শেষ নেই এই পথে চলাচলকারীদের। মগবাজার চেয়্যারম্যান গলির বাসিন্দা মনির হেসেন জানান, গত রোজার মাসের আগে থেকে এ রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু হয়েছে। প্রথমে ওয়াসার কাজ করে চলাচলের অনুপযোগী করে গেছে মধুবাগ বাজার থেকে মগবাজার চৌরাস্থা পর্যন্ত সড়কটি। এখন আবার কাজ শুরু করেছে নতুন করে। জানি না এ দুর্ভোগ কবে শেষ হবে।
মধুবাগ থেকে মগবাজার ওয়্যারলেস পর্যন্ত সড়কেও ওয়াসার কাজ চলছে। এই সড়কটি হাতিরঝিলের সাথে সংযুক্ত হওয়ায় মাঝে মধ্যেই দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। মৌচাক-মগবাজার সড়কের দুই পাশেই রাস্তা খুঁড়ে ওয়াসার পাইপ বসানোর কাজ চলছে। মৌচাক সড়কের এক পাশে ফুটপাথসহ সড়ক কেটে রাখা হয়েছে। কাজেরও খুব একটা অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। ফলে ওই এলাকার বাসিন্দারা আছেন ভোগান্তিতে। রাজধানীর খিলগাঁও, কমলাপুর, শাহজাহানপুর, আরামবাগ, মতিঝিল, ওয়ারী, রামপুরা, ফকিরেরপুল, বাড্ডা, ধানমন্ডি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি ও মোহাম্মদপুর এলাকার বেশ কয়েকটি সড়কে কাজ চলায়, সংযোগ সড়ক বন্ধ রয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় খোঁড়া গর্তে কাজ শেষে উঁচু করে মাটি ভরাট করে রাখা হয়েছে। ফলে রিকশা আরোহীরা চলাচলে বারবার বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে।
কমলাপুর রেলস্টেশনমুখী প্রায় প্রতিটি সড়কেই চলছে সংস্কারকাজ। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কগুলোতেও থেমে থেমেকাজ করায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে কমলাপুরগামী মানুষকে ভোগান্তি পেরিয়েই গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। রাস্তার কাজ বন্ধ হয়ে আছে শাজাহানপুর মোড় থেকে রাজারবাগ কেন্দ্রিয় পুলিশ হাসপাতাল ও ফকিরেরপুলমুখী মূল সড়কটির এক পাশ। পাইপ বসানোর কাজ দুই মাস আগে শেষ হলেও এখনো সব কাজ শেষ হয়নি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকা মিরপুর-১২ থেকে কাজিপাড়া, শেওড়াপাড়া, আগারগাঁও হয়ে মনিপুরীপাড়া পর্যন্ত সড়কটির মেট্রোরেলের কাজ চলার কারণে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাগুলো সরু হয়ে গেছে। কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার এক পাশের বড় একটি অংশ বন্ধ রয়েছে। ফলে গুলিস্তান ও মতিঝিলগামী যানবাহনগুলো গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা। অল্প বৃষ্টিতেই জমছে পানি। মিরপুর থেকে গুলিস্তান রুটের ইটিসি পরিবহনের চালক নাজমুল হোসেন বলেন, আগে মিরপুর-গুলিস্তান রুটে যেখানে পাঁচটি ট্রিপ দিতাম, এখন সেখানে দুইটার বেশি দিতে পারি না। তিন ঘণ্টা লাগে গুলিস্তান পৌঁছতে।
রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তোপখানা-পল্টন মোড় থেকে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়কটির দুই প্রান্তে কয়েক মাস ধওে খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। প্রথমে ওয়াসার স্টর্ম স্যুয়ারেজ লাইনের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি হয়। এরপর শুরু হয়েছে মেট্রোরেল নির্মাণের কাজ। রাস্তার দুই পাশের অর্ধেক বন্ধ করে এখনো তা চলছে। হাইকোর্ট থেকে প্রেস ক্লাবের সামনের সড়ক দিয়ে পল্টনমুখী সড়কটির অর্ধেকের বেশি খোঁড়া। এর একটি খোঁড়া অংশ ভরাট করে কোনো রকম মাটি দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। মাত্র এক লাইনে চলাচল করছে গাড়িগুলো। ফলে দীর্ঘ লাইনে গাড়িগুলোকে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে দেখা গেছে অনেককেই। গতকাল আনোয়ারুল ইসলাম নামে এক পথযাত্রী জানান, এত যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না। সকাল সাড়ে ৯টায় আশুলিয়া থেকে গাড়িতে উঠেছি, যাব যাত্রাবাড়ী। এখন বাজে আড়াইটা। মাত্র প্রেস ক্লাবের সামনে আসলাম। এক জায়গায়ই ৩৫ মিনিট ধরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এখনো পল্টন মোড়েই পৌঁছতে পারলাম না। যাত্রাবাড়ী যাব কখন?
পল্টন মোড় থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব, দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি, শাহবাগ ও বাংলামোটর হয়ে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের নির্মাণকাজের জন্য সড়কের অর্ধেক জায়গা কেটে রাখা হয়েছে। নগরবাসীকে এই সড়কগুলোতে চলতে গিয়ে সীমাহীন যানজটসহ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দুই থেকে তিন লেনের সড়কগুলোর দুটি লেনই বন্ধ রয়েছে। বাকি এক বা দুইটি লেন দিয়ে যানবাহনগুলোকে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। দিনভর পুরো সড়কে যানজট লেগেই থাকে। পল্টন ও প্রেস ক্লাব পর্যন্ত সড়কের বেহাল দশার কারণে যানবাহনগুলোকে বিকল্প সড়ক হিসেবে সেগুনবাগিচা এলাকার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এতে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে।
সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী সেবা সংস্থাগুলো কাজ না করায় প্রতি বছরই এমন পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয় নগরবাসীকে। নগরীতে একাধিক সেবা সংস্থা কাজ করে। প্রতিটি সংস্থাই তার নিজের মতো করে কাজ করছে। কারো সাথে কারো কোনো সমন্বয় নেই। সমন্বিত কাজ না হলে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বেই। সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, রাজধানী ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা ওয়াসা, বিটিসিএল, তিতাস, ডেসা, ডেসকো, রাজউকসহ অন্তত ২৬টি সেবাদানকারী সরকারি সংস্থা কাজ করে। এসব সংস্থার বিভিন্ন সংস্কার ও উন্নয়নকাজে প্রায়ই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির করতে হয়।
ঢাকার দুই সিটিতে সব মিলিয়ে রাস্তার পরিমাণ দুই হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির ২৭টি প্রধান সড়ক এবং ২৫০টির মতো অভ্যন্তরীণ সড়কে চলছে বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি। আর সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে ২৬৯টি রাস্তায় চলছে উন্নয়নকাজ। অন্য দিকে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক হাজার কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ১৫টি প্রধান সড়কেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এর মধ্যে ২৫৯ দশমিক ৬১ কিলোমিটার সড়ক, ২৬১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার ড্রেন এবং ৫১ দশমিক ৫১ কিলোমিটার ফুটপাথের নির্মাণকাজ চলছে। সব মিলিয়ে এমন অবস্থা প্রায় সড়ে ৫০০ কিলোমিটারে রাস্তায়। নগরপরিকল্পনাবিদেরা নিয়ম মেনে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি ও সংস্কারকাজ করার জন্য বারবার পরামর্শ দিলেও সংশ্লিষ্টরা এসব বিষয় খুব একটা আমলে নেন না। তারা নিজেদের মতো করেই কাজ চালিয়ে যান বছরজুড়ে।
ছবি : নয়া দিগন্ত আর্কাইভ


আরো সংবাদ