ঢাকা, বৃহস্পতিবার,২৪ অক্টোবর ২০১৯

দিগন্ত সাহিত্য

সাদা খাম আলোকিত চিঠি-৯

কে জি মো স্ত ফা

০১ এপ্রিল ২০১৬,শুক্রবার, ০০:০০


প্রিন্ট

প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

জীবনটাই এক পুস্তক বিশেষ, নানা অধ্যায়ে ভরা। রকমারি জানা ও শোনার ব্যাপার। আমার জীবন একেকবার একেক রকম কাজে আমাকে টেনে নিয়েছে নিজেরই টানে।
প্রতিদিন রিকশায় শহীদ মিনারের পাশ দিয়ে যাতায়াত করি। নিত্য চোখে পড়ে সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সেকালের বাসভবনটি। পুরনো পথের সে রেখা আজো আমায় টানে।
অদূর অতীতের স্মৃতি। সচিত্র বাংলাদেশ সম্পাদনাকালে প্রায়ই যেতাম তাঁর বাসায়। একটি মননশীল লেখা পাওয়ার আশায়। তিনি কখনো বিমুখ করেননি। মাঝেমধ্যে এমনিতেও যেতাম তাঁর অনবদ্য কথাবার্তা শোনার জন্য। জগৎ-জীবন সম্পর্কে তাঁর এক উদার মানবিক আবেদন, সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণশক্তি, গভীর উপলব্ধি অনুভূতি। অবাক হয়ে শুনতাম। মন ভরে যেত।
তিনি বাসায় না থাকলে তাঁর সুশীলা স্ত্রী মরহুমা নাজমা চৌধুরীর আন্তরিক অভ্যর্থনা ও আপ্যায়ন কোনো দিন ভুলবার নয়।
প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধান প্রাবন্ধিক। প্রায় ৪০টি সৃষ্টিশীল ও মননশীল গ্রন্থের প্রণেতা। বহুবর্ণ রঞ্জিত তাঁর প্রবন্ধ-নিবন্ধে সামাজিক মূল্যবোধ এবং সংস্কারমুক্ত জীবন গড়ার বার্তা।
বর্তমানে তিনি ‘নতুন দিগন্ত’ নামে একিিট সাহিত্য পত্রিকা করছেন। ইতঃপূর্বেও তিনি একাধিক সাহিত্যপত্র সম্পাদনা করতেন। সম্পাদক হিসেবে তিনি অনবদ্য, অনন্য। পাশাপাশি ‘সমাজ রূপায়ণ অধ্যয়ন কেন্দ্র’ নামে একটি প্রাগ্রসর প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত রয়েছেন। আসলে তিনি আমাদের পশ্চাৎপদ সমাজকে এগিয়ে নেয়ার বাতিঘর।
শ্রদ্ধেয় প্রফেসর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে এ যাবৎ বহু পুরস্কারে ভূষিত।


রিজিয়া রহমান

সম্ভবত ’৮০-এর দশকে রিজিয়া রহমানের প্রথম উপন্যাস ‘রক্তের অক্ষর’ পড়ে আমি অনেকটা থতমত। ব্যক্তিগতভাবে তখনো তাঁকে চিনতাম না। ভাবলাম নারীর ছদ্মনামে নিশ্চয়ই এটা কোনো পুরুষ-লেখকের লেখা। যেহেতু উপাখ্যানটি পতিতাদের নিয়ে, লজ্জাবশত হয়তো লেখক-ভদ্রলোক নারীর নাম ধারণ করেছেন। কিন্তু পরে যখন জানলাম লেখক সত্যিই একজন নারী, নাম রিজিয়া রহমান। আমি তো রীতিমতো অবাক। এমন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে একজন লেখিকা পতিতাপল্লীর চিত্র আঁকতে পারেন, ধারণাই করা যায় না। তাঁকে দেখার জন্য তাঁর সাথে যোগাযোগ করলাম এবং সচিত্র বাংলাদেশে লেখার জন্য আমন্ত্রণ জানালাম। যথাসময় তিনি এলেন। আলাপচারিতায় মুগ্ধ হলাম। তাঁর লেখার ভক্ত হয়ে গেলাম। সচিত্র বাংলাদেশ দফতরে মাঝে মাঝে আসতেন এবং গল্প দিতেন। বাংলাদেশের সাহিত্যভুবনে এমন একজন শক্তিমান লেখিকা আছেন, সেটা সত্যি আমাদের গর্বের বিষয়।
শুনেছি প্রথম জীবনে তিনি কবিতা ও ছড়া লিখতেন। কিন্তু ছোটগল্প ও উপন্যাসে তাঁর অসাধারণ পারদর্শিতা। কাহিনীবিন্যাস, চরিত্রচিত্রণ ও ভাষাশৈলীতে তিনি অনন্য।
‘রক্তের অক্ষর’-এর পর রিজিয়া রহমানের বৃহদাকার দ্বিতীয় উপন্যাস ‘বং থেকে বাংলা’। বাংলাদেশের জাতি গঠন ও ভাষার বিবর্তন নিয়ে উপন্যাসটির ব্যাপ্তি। একই সাথে ইতিহাস এবং একটি জাতি কিভাবে স্বাধীনতার মর্যাদায় এসে দাঁড়িয়েছে তার নিখুঁত বিবরণ।
অসাধারণ এ উপন্যাসটি পাঠকমহলে ব্যাপক সাড়া জাগায়। এরপর একে-একে বৃহৎ কলেবরে তাঁর একাধিক উপন্যাস প্রকাশিত হলো। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থÑ ‘অগ্নিসাক্ষরা’, ‘ঘর ভাঙা ঘর’, ‘রক্তের অক্ষর’, ‘বং থেকে বাংলা’, ‘অরণ্যের কাছে’ ইত্যাদি।
তাঁর সুখপাঠ্য দু’টি আত্মজীবনী ‘অভিবাসী আমি’ ও ‘নদী নিরবধি’।
তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন।
একজন সনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে আমার কাছে তাঁর উপন্যাস নিছক উপন্যাস নয়। বলা যায় গবেষণামূলক উপন্যাস অথবা উপন্যাসমূলক গবেষণা। আসলে তাঁর উপন্যাস যেন না-লেখা ইতিহাসের কিছু পাতা।

আহমদ রফিক

কত স্মৃতি জেগে আছে বুকে। তৎকালীন ‘রূপম’ পত্রিকার সম্পাদক মরহুম কবি আনওয়ার আহমদ একদা আমাকে ভাষাসৈনিক ও বিশিষ্ট লেখক ডা. আহমদ রফিকের চেম্বারে নিয়ে যান। আহমদ রফিক একজন ভাষাসৈনিক। তিনি এমবিবিএস ডাক্তার।
একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।
পরিচিতিপর্বে তাঁর সাদর অভ্যর্থনা ও আপ্যায়নে আমি মুগ্ধ। খুবই সংবেদনশীল ও সমঝদার মানুষ। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। সবিনয়ে তাঁর কাছে আমি সচিত্র বাংলাদেশের জন্য লেখা চাইলাম। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। দু-তিন দিনের মধ্যে লেখা পেয়ে গেলাম। এভাবে আমাদের সম্পর্ক শুরু। বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে কখন যে সহৃদয় সখা হয়ে গেলাম! কতবার কত ধরনের লেখা দিয়ে যে তিনি আমাকে সাহায্য করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
জনাব আহমদ রফিকের গবেষণার বিষয় সমাজ, সাহিত্য, রাজনীতি ও বিজ্ঞান। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবন ও সাহিত্যবিষয়ে তাঁর গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। সর্বোপরি সামাজিক দায়বদ্ধতায় বিশ্বাসী এক সাহিত্যকর্মী। মনোরঞ্জন অপেক্ষা মনন জাগরণে বিশেষ উৎসুক তিনি।
পঞ্চাশের দশক থেকে তিনি অদ্যাবধি কবিতা লিখছেন। অতিসম্প্রতি তাঁর একটি কাব্যগ্রন্থ আমাকে উৎসর্গ করেছেন। আমি বিশেষভাবে আপ্লুত, আমি কৃতজ্ঞ। আমার গদ্যগ্রন্থ ‘কোথায় চলেছি আমি’র ওপর তাঁর নাতিদীর্ঘ একটি আলোচনা সাম্প্রতিককালে দৈনিক ইত্তেফাকে ছাপা হয়েছে।
কিয়দংশ উল্লেখ করছিÑ ‘‘কবি, গীতিকার কে জি মোস্তফা বিশ্বমানের ‘বিশৃঙ্খলা’কে মেনে নিয়েই প্রাকৃত সৌন্দর্য আর জীবনের প্রতি ভালোবাসাকে যেন নিয়তিসম মেনে নেন। সাজাতে থাকেন শব্দের সুশৃঙ্খল বিন্যাস। ‘ভালোবাসা’ শব্দটি নিয়ে প্রগলভ ছিলেন কবি গীতিকার রবীন্দ্রনাথ। সে শব্দটির গভীর তাৎপর্য উপলব্ধি করেছিলেন আর্জেন্টিনাবাসী কবি-অনুরাগিণী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো।
আর জীবনমৃত্যু ও মহাবিশ্বের বিস্ময়? এসব নিয়ে যে সংশয়ের তীর পদার্থবিজ্ঞানী জিন্্স থেকে আইনস্টাইন এবং একাধিক বিজ্ঞানীর গভীর ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তার কিছুটা উল্লেখ করেছেন কে জি মোস্তফা তার লেখার শেষপর্বে পৌঁছে। করারই কথা। প্রশ্নটি তো শাশ্বত চরিত্রের।”
মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, নিসর্গপ্রীতি, লোকায়ত ঐতিহ্য ও সমাজবিপ্লবের আকাক্সা জনাব আহমদ রফিকের কবিতার বিষয়বস্তু। এই বোধ থেকেই উৎসারিত হয়েছে তাঁর সমগ্র সাহিত্যকর্ম। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণা ও অনুবাদ মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা প্রায় ৩০। দেশ-বিদেশের বহু পুরস্কারে ভূষিত তিনি। ব্যক্তিজীবনে সৃষ্টির ভুবনে তিনি আজো অম্লান।
আনন্দে পাখি গায়। পৃথিবীতে ফোটে ফুল। ফোটে কেয়া-কদম। প্রেম-সৌন্দর্য-সুরের পৃথিবীতে একান্ত আমার আমি। সাথে আছে কত চেনা মানুষ! স্মৃতি কণ্ডুয়নে আছে ভাবনার দেয়া-নেয়া। মন বলে যেখানেই যাও সঙ্গে আছি।
লেখক : গীতিকার কবি কলামিস্ট

 

 

Logo

সম্পাদক : আলমগীর মহিউদ্দিন

প্রকাশক : শামসুল হুদা, এফসিএ

১ আর. কে মিশন রোড, (মানিক মিয়া ফাউন্ডেশন), ঢাকা-১২০৩।
ফোন: ৫৭১৬৫২৬১-৯

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | নয়া দিগন্ত ২০১৫