২২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

হ্যান্ড অব গড নাকি স্রেফ ধোঁকা

হ্যান্ড অব গড নাকি স্রেফ ধোঁকা
হ্যান্ড অব গড নাকি স্রেফ ধোঁকা - ইন্টারনেট

নিউরো-সাইকিয়াট্রিয়াতে "এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম" বলে একটি রোগ আছে। এলিয়েন অর্থ ভিনগ্রহবাসী বা ভূত। মানে 'ভূতের হাত রোগ'। এ রোগে রোগীর হাত তার নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। অর্থাৎ হাতের নড়াচড়া বা হাতটির কর্মযজ্ঞের উপর রোগীর নিজস্ব কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। হয়তো রোগী আপনার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ করেই আপনাকে মেরে বসলো একটা কিল। আপনিও জেঁকে বসলেন, 'ব্যাটা মশকরা করো'?। সে বার বার ক্ষমা চেয়ে বুঝাতে চাইল, ’ওটা তার ইচ্ছে মাফিক হয়নি। তার কোনো হাত নেই ওতে, মাঝেমধ্যে তার ওরকম হয়ে যায়..'।

বিষয়টি অনেকটা রহস্যময় ভৌতিক মনে হলেও এমনটি হতে পারে। সাধারণত ব্রেনের কিছু রোগে এমন হয়। যেমন স্ট্রোক, হেড ইনজুরি, ইনফেকশন, এলজিমারস, অপারেশন কিংবা জেনেটিক্স। এগুলো খুব দুর্লভ, চেম্বারে তেমন একটা পাওয়া যায়।

মৃগী রোগী যে রকম হঠাৎ করে হাত পা কাঁপাকাঁপি করে ধুম করে পড়ে যায়, এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোমের রোগীর বিষয়টাও তাই। তবে এখানে রোগী অজ্ঞান হয় না বা পড়ে যায় না। একটু কিল ঘুষি কিংবা খোঁচা ইত্যাদি মেরে বসেন, এই যা। মনে হয় অনেকটা ভুত বা এলিয়েনের কাজ। তাই এর নাম 'এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম' বাংলায় এর নাম করলে দাঁড়ায় 'ভুতের হাত রোগ'।

এবার আসি আর্জেন্টাইন এক প্লেয়ার এর কথায়। তার নাম দিয়েগো ম্যারেডোনা। এক সময় খুব ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। পরে মাদক, নারী ইত্যাদি নানান কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে জীবন যায় যায়।

বিশ্বকাপ ফুটবল খেলায় সেই ম্যারেডোনা একবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে একটি গোল হাত দিয়ে দেন। সেটা আবার অনেকে বলেন, অফসাইড ও ছিল। কিন্তু রেফারি সাহেব সে সময় কিছুটা ভিন্ন অ্যাংগেলে থাকায় এর সব কিছুই তার চোখ এড়িয়ে যায়। ইংল্যান্ড খেলোয়াড়রা বার বার হ্যান্ডবল দাবি করলেও ম্যারেডোনা মিথ্যে অভিনয় করতে থাকেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেন। ফলে রেফারি গোল বলেই সিদ্ধান্ত দেন। পরে ভিডিও দেখে পরিষ্কার হয় যে, আসলে এটা ছিল হ্যান্ডবল। কিন্তু ততক্ষণে যা হবার হয়ে গেছে।

পরে অবশ্য ম্যারেডোনা তার দোষ স্বীকার করেন। সেখানেও তিনি মিথ্যের আশ্রয় নেন। বলেন হাত লেগেছে তবে ওটা তার হাত নয় 'ঈশ্বরের হাত'। 'হ্যান্ড অব গড'। একটা মিথ্যে ঢাকতে কৌশলে আরো দশটা গাঁজাখুরি মিথ্যের আশ্রয় । কারণ সত্য বললে, মিথ্যে অভিনয়ের জন্যে তার হয়তো শাস্তি পেতে হতো। তাই গডের উপর দিয়ে চালিয়ে দেয়া। গডের আর কাজ নেই, মানুষের আদালতে এসে মিথ্যেবাদী ম্যারেডোনার বিপক্ষে সাক্ষ্য দেয়া।

এলিয়েন হ্যান্ড বা ভুতের হাতের ব্যাখ্যা থাকলেও ম্যারেডোনাদের এই 'হ্যান্ড অব গড' থিউরি বলে কোনো কথা নেই। গড বসে নেই তার হ্যান্ড দিয়ে কুকর্ম করতে। তবে আমাদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে, সেটা হলো- 'শয়তানের হাত'।

মানুষের কোনো প্রকারের কুকর্ম যখন মানুষ বা আমরা প্রমাণ করতে না পারি, তখন আমরা বলি এটা 'শয়তানের কাজ', বা এতে শয়তানের হাত আছে, মানুষরূপী শয়তানের হাত।

এখন ম্যারেডোনার গোলটির সমর্থনে যদি কিছু বলতে হয় তাহলে সেটা 'এলিয়েন হ্যান্ড সিনড্রোম' বা 'হ্যান্ড অব এলিয়েন' বা 'ভুতের হাত' এসব কিছুই বলা যাবে না। কারণ তার এরকম কোনো নিউরো-সাইকিয়াট্রিক রোগ ছিল না। যা বলা যাবে সেটা হলো- ধোঁকাবাজের হাত। 'হ্যান্ড অব ফ্রট', কারণ খেলোয়াড়রা মাঝেমধ্যে ওরকম ছলা-কলার, ধোঁকাবাজির আশ্রয় নিয়ে থাকেন জেতার জন্যে।

আর বোধ হয় এটা ভেবেই এবারের ওয়ার্ল্ড কাপে ভিডিও রেফারিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারপরও আর্জেন্টিনা আর নাইজেরিয়ার খেলায় আমরা এক আর্জেন্টাইন মিড ফিল্ডারকে ফের হাত দিয়ে বল ঠেকাতে দেখি। অবশ্য এটা নাকি হ্যান্ডবল নিয়মের মধ্যে পড়েনি, তাই হ্যান্ডবল দেননি রেফারি।

পরিশেষে বলতে পারেন, আমি বোধ হয় প্রচণ্ড আর্জেন্টিনাবিরোধী ব্রাজিলের এক সমর্থক। না, আসলে তেমনটি নয়। আমি এদের কাউকেই সমর্থন করি না। আমি তাদের সমর্থন করি যাদের জন্য আমি দুবেলা দুটো ভাত খেতে পারছি, টিভি খুলে বিশ্বকাপের দু একটা খেলা দেখতে পারছি। এ আবার কেমন কথা?

একটু খুলেই বলি। এই কয়েক দশক আগেও আমরা ছিলাম তলাবিহীন ঝুড়ি। আমাদের তাচ্ছিল্য করে তাই বলা হতো। দুর্ভিক্ষে আমাদের দেশে শত শত মানুষ মারা যেত। পান্তা খেয়ে আমাদের চলতে হতো। এখন আমরা আর ওরকম নই। আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। আমরা দু'বেলা খেতে পারছি। ঘরে ঘরে না হলেও, পাড়ায় পাড়ায় এখন টিভি-ফ্রিজ আছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে কেবল বৈদেশিক রেমিটেন্সের জন্যে।

অর্থাৎ আমাদের যে সকল ভাই-বোন বিদেশের বিভিন্ন দেশ থেকে কষ্ট করে উপার্জন করে টাকা পাঠাচ্ছেন তাদের জন্যে। আর ওই সব দেশের জন্যে যেগুলো এর সুযোগ করে দিয়েছে, যেমন- সৌদি, কাতার, ফ্রান্স, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইতালি, সুইডেন, ডেনমার্ক। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা নয়। সর্বদা বাংলাদেশকে বাঁশ দিচ্ছে এরকম কোনো দেশকে আমি ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় কখনো সমর্থন করি না, করতে পারি না। এটা আমার ব্যর্থতা।

কাউকে কষ্ট দিতে আসলে লেখাটা লিখলাম না। আমি বড্ড সেকেলে আর আন স্মার্ট মানুষতো, তাই বোধ হয় ভিন দেশের বড় বড় পতাকা ঘরে বাইরে উড়তে দেখলে এমন লেখা চলে আসে। দেশের স্বার্থ, দেশের পতাকা খুঁজেফিরি সব কিছুতে। যারা খেলার উন্মাদনায় শত শত, হাজার হাজার টাকা দিয়ে বিদেশের পতাকা উড়াচ্ছেন ঘরে বাইরে, আপনারা কি নিজের দেশের পতাকা জীবনে একবারের জন্যেও আকাশে উড়িয়েছেন, এ প্রশ্ন রইল আপনাদের কাছে।

লেখক : সাইকিয়াট্রিস্ট, ডি এম সি (কে-৫২)


আপনিও লিখুন নয়া দিগন্ত অনলাইনে

নয়া দিগন্তের অনলাইন সংস্করণে  লিখতে পারেন আপনিও। তাহলে আর দেরি কেন? আজই পাঠিয়ে দিন আপনার লেখা ফিচার, মতামত, প্রবাস, ভ্রমণ অথবা জীবনের গল্প। সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট ছবি ও ভিডিও পাঠাতে পারেন। তাছাড়া পাঠাতে পারেন বিভিন্ন অনুবাদ লেখাও। তবে লেখা যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত হতে হবে। আমাদের ইমেইল ঠিকানা : [email protected]


আরো সংবাদ

Hacklink

ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme